৫ লাখের মতো প্রবাসী ফিরেছেন, পরীক্ষা ছাড়াই পার হয়েছে বিমানবন্দর

প্রথমবারের মতো ৮ মার্চ বাংলাদেশে ৩ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর থেকে নানা পদক্ষেণ নেয়া শুরু করে সরকার। সম্প্রতি সময় বিদেশ থেকে ফেরা প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টিনে রেখেছে সরকার।

তবে বিবিবি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশি যারা এপর্যন্ত দেশটিতে এসেছেন, তাদের বিশাল অংশই পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে বিদেশ থাকা আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশটির ২০টি জেলায় প্রায় দুইশো জনকে নিজ নিজ বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় হোম কোয়ারিন্টিনে রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, গত প্রায় দুই মাসে চীন-ইতালিসহ ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সাড়ে পাঁচ লাখের মতো বাংলাদেশি দেশে এসেছেন। তাদের বেশিরভাগই কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ঢাকায় বিমানবন্দর পার হয়ে গেছেন।

বেশ কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গেও কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক, যারা করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে দু’সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরেছেন।  তারা বলছেন, ‘দেশে আসার পর থেকে আত্নীয়স্বজনের সাথে থাকাসহ উন্মুক্ত পরিবেশেই রয়েছেন। কোনো পর্যবেক্ষণ না থাকায় তাদেরই অনেকের মাঝে এখন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ফিলেছেন এই ইতালিয়ান প্রবাসী। তিনি ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই বেরিয়ে আসেন। তিনি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি শরিয়তপুর জেলায় তার গ্রামের বাড়িতে যান। এই প্রবাসী বলছিলেন, যদিও তিনি সুস্থ রয়েছেন, কিন্তু কোনো পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের মধ্যে না পড়ায় তার নিজের মাঝেই এক ধরণের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘২৯ ফেব্রুয়ারি রাত ২টায় আমি ঢাকায় বিমানবন্দরে নেমেছি। এখানে আসার পর একটা ফরম দিছে। সেটা পূরণ করে জমা দেয়ার পর আর কিছুই আমাকে বলেনি। শুধু ইমিগ্রেশন যখন পার হই, তখন পাসপোর্ট দেখে বললো, আপনার কি পরীক্ষা হয়েছে? আমি বললাম না। তখন ইমিগ্রশনে বললো, পরীক্ষাটা হলে ভাল হতো। এই বললো। আর কিছুই না। তারপর পাসপোর্টে সিল মেরে দিলো। আমি এসে পড়লাম।’]

তিনি জানান, যে ফরমটা পূরণ করেছেন, তাতে কোন দেশ থেকে এসেছেন, সেই দেশের নাম এবং পাসপোর্ট নম্বর-এসব লিখতে হয়েছে। ১২ দিন ধরে দেশে এসে তাকে কেউ পর্যবেক্ষণ করেনি বা সরকারের কোনো বিভাগ থেকে তাকে কোনো পরামর্শও দেয়া হয়নি।

তিনি বিদেশ থেকে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন কিনা, এই প্রশ্নে তিনি বলছিলেন, ‘এখন বাড়িতে আসছি, আত্মীয়-স্বজন বা ভাইবোনরাতো আসবেই। তাদের কাছে না গিয়ে বা তাদের সাথে কথা না বলেতো পারি না। তবে পাবলিক অনুষ্ঠানে কম যাই।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘কোথাও কোনো বাধা আমি পাই নাই। আজকেই আমার গ্রামের এলাকার থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা আমাকে টেলিফোন করে নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলো। আর বললো যে, কতদিন হয়েছে দেশে এসেছেন। আমি বললাম ১২দিন হবে। তখন সেই পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, আরও দুই তিন দিন বাড়িতে থাইকেন। এটুকুই।’

যখন চীনে এই ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করে তখনই বিমানবন্দরে করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের তিনটি থার্মাল স্ক্যানারের মাধ্যম স্ক্যানিং ব্যবস্থা করা হয়। যদি পরে তা বিকল হয়ে যায়। এরপর কয়েকটি স্ক্যানারের ব্যবস্থা করে সরকার।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ২১জানুয়ারি থেকে বিমানবন্দর এবং স্থলবন্দরগুলোতে স্ক্যানিং ব্যবস্থা করার পর থেকে এপর্যন্ত আড়াই লাখের বেশি যাত্রীকে পরীক্ষা করা হয়েছে। সরকারি হিসাবেই এই সময়ে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের বড় অংশ সেই পরীক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।

ইতালি থেকে ফেরা আরেক বাংলাদেশ বলেন, ‘বাড়িতে থেকে পুরোপুরি কোয়ারেন্টিনে থাকা সম্ভব হয় না। তাকেউ বিমানবন্দরে পরীক্ষা করা হয়নি। বিমানবন্দরে পরীক্ষা করার মতো অবস্থা বলা চলে যে ছিল না। কয়েকটা ফ্লাইটের এক হাজারের মতো যাত্রী ছিল। সেখানে এত যাত্রীকে পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত জায়গাই ছিল না। শুধু সতর্কতামূলক একটা লিফলেট হাতে ধরিয়ে দেয়। এটুকুই।’

‘তারপরও আমি নিজ দায়িত্বে বাসায় এসে নিজের শংকা থেকে বাড়িতেই অবস্থান করি। সামাজিকভাবে কারও সাথে মেলা মেশা করি না। কোয়ারেন্টিন যেটা, সেটা পুরোপুরি করে ওঠা সম্ভব হয়নি। কারণ পরিবারের সদস্যরা আছে। কিন্তু বাজারে যাওয়া বা বাড়ির বাইরে সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া আমি এড়িয়ে চলছি।’

সরকারের পক্ষ থেকে দেশে আসা বাংলাদেশিদের নিজে থেকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকার পরার্শ দেয়া হচ্ছে। সেটা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রোগতত্ত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিউটের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আমরা এটা কিছুটা সফটলি করছি। কারণ এমনিতেই দেশে অনেকের মধ্যে একটা আতংক বিরাজ করছে। তারপর যদি আমরা খুব হার্ড লাইনে যাই, তাহলে একটা খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।’

তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘কিছুটা জায়গায় কিছু ব্যাপ্তয় ঘটেছে। কিন্তু আগের তুলনায় পর্যায়ক্রমে এটা ইমপ্রুভ করেছে। কিন্তু যাদের মধ্যে লক্ষণীয় উপসর্গ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে কঠোরভাবেই আমরা আইস্যুলেশনে রেখে নমুনা পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ৎ