১০৬ বছরে পা দিল ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ উদ্বোধনের পর ১০৬ বছরে পা রাখলো। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রেলসেতু উদ্বোধন করে। তবে স্থাপিত নামফলক হিসেবে এটি ১০৮ বছর পার করেছে।

১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের রেল যোগাযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে ভারতের দার্জিলিং ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে যাতায়াতের সুবিধার্থে বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার সীমারেখা পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করে। সেতু বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে ও ১৯১২ সালে স্থাপিত নামফলক দেখে জানা যায়, ২০১০ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১০০ বছর পার করে।

ঐ সময় পদ্মা নদীর পূর্ব তীর বর্তমান পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাড়াঘাট ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ নদীবন্দর। যেখানে দেশি-বিদেশ বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ, বার্জ, মহাজনী নৌকা ইত্যাদি ভিড়তো সাঁড়া বন্দরের ১৬টি ঘাটে। এমতাবস্থায় খরস্রোতা পদ্মাগর্ভে বহু লঞ্চ, স্টিমার ডুবে প্রাণহাণি ও মালামালের ক্ষতিসাধিত হত।

বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দার্জিলিং ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে দেশি-বিদেশি পর্যটক যাতায়াত ও মালামাল পরিবহণের সুবিধার্থে ভারতের কাঠিহার থেকে রেলপথ আমিন গাঁ আমনুরা পর্যন্ত সমপ্রসারিত করার লক্ষ্যে অবিভক্ত ভারত সরকার তখন পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব পেশ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯ সালের ব্রিজ তৈরির সেই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত চার বছর ধরে ব্যাপক স্টাডি করে ম্যাচ এফ জে সপ্রিং একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে। দীর্ঘ জরিপের পর সাঁড়া ঘাটের দক্ষিণে ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাব্যতার তথ্য সরকারের কাছে সরবরাহ করে এবং ১৯০৭ সালে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।

১৯০৮ সালে ব্রিজ নির্মাণের মঞ্জুরি লাভের পর ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে ইঞ্জিনিয়ার ইন চীফ হিসেবে ব্রিজের মূল নকশা প্রণয়নের জন্য স্যার এস এম বেনডেলেগকে ও প্রকল্প প্রণয়ন জন্য স্যার ফ্রান্সিস সপ্রীং এবং ঠিকাদার হিসাবে ব্রেইথ ওয়াইট এন্ড কার্ককে দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় কূপ খনন, বসানো হয় ১৫টি স্প্যান যার প্রতিটি বিয়ারিং টু বিয়ারিং এর দৈর্ঘ্য ৩শ ৪৫ ফুট দেড় ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৫২ ফুট। প্রতিটি স্প্যানের ওজন ১ হাজার ২শ ৫০ টন। রেল লাইনসহ ১ হাজার ৩শ টন, এছাড়াও দু’পাশে ল্যান্ড স্প্যান রয়েছে যার দূরত্ব ৭৫ ফুট। ব্রিজটির মোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৮শ ৯৪ ফুট (১ মাইলের কিছু বেশি)। ব্রিজ নির্মাণে মোট ইটের গাঁথুনি ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ইস্পাত ৩০ লাখ টন, সাধারণ সিমেন্ট ১ লাখ ৭০ হাজার ড্রাম এবং কিলডসিমেন্ট (বিশেষ আঠাযুক্ত) লাগানো হয় ১২ লাখ ড্রাম।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১ হাজার গজ ভাটি থেকে ৬ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ১৬ কোটি ঘন ফুট মাটি ও ২ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ঘনফুট পাথর ব্যবহার করে গাইড বাধ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩ কিলোমিটার ক্রস নদীর পাবনার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ সালে দু’পাশে বাধ দিয়ে ১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার নদী সংকুচিত করা হয় এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের সময় ব্রিজটির অ্যালাইনমেন্টে নদীর পানির বহন ক্ষমতা দাঁড়ায় ২৫ লাখ ঘনফুট।

১৯১২ সালের আগে শ্রমিক সংখ্যা কম থাকলেও ১ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ থেকে প্রকল্পটিতে কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় তখন থেকে ২৪ হাজার ৪শ শ্রমিক যারা দীর্ঘ ৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৪ সালের শেষের দিকে ব্রিজটির কাজ শেষ করে। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ডাউন লাইন দিয়ে প্রথম মালগাড়ি (ট্রেন)চালানো হয়। ২ মাস পর ৪ মার্চ ডবল লাইন দিয়ে যাত্রীবাহি ট্রেন চলাচল শুরু করে। সে সময় ব্রিজটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন, তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামানুসার ব্রিজটির নামকরণ হয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

তখনকার সময় ব্রিজটি তৈরিতে মোট ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১শ ৬৪ টাকা। এর মধ্যে স্প্যানের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ ৬ হাজার ৭শ ৯৬ টাকা, ল্যান্ড স্প্যানের জন্য ৫ লাখ ১৯ হাজার ৮শ ৪৯ টাকা, নদীর গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৯৪ লাখ ৮ হাজার ৩শ ৪৬ টাকা ও দুই পাশের রেল লাইনের জন্য ৭১ লাখ ৫৫ হাজার ১শ ৭৩ টাকা।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ সরকারের র্নিমিত ব্রিজটির খ্যাতি বিশাল পরিচয় বহন করে। বর্তমান জগতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের চেয়েও লম্বা ব্রিজজ ও সেতু অনেক আছে। কিন্ত কিছু কিছু কারণে এ ব্রিজটি অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে বিখ্যাত। প্রথম কারণ হচ্ছে এ ব্রিজের ভিত গভীরতম পানির সর্বনিম্ন সীমা থেকে ১৬০ ফুট বা ১৯২ এমএসএল মাটির নিচে। এর মধ্যে ১৫ নম্বর স্তম্ভের কুয়া স্থাপিত হয়েছে পানি নিম্নসীমা থেকে ১শ ৫৯ দশমিক ৬০ ফুট নিচে এবং সর্বোচ্চ সীমা থেকে ১শ ৯০ দশমিক ৬০ ফুট অর্থাৎ সমুদ্রের গড় উচ্চতা থেকে ১শ ৪০ ফুট নীচে। সে সময় পৃথিবীতে এ ধরনের ভিত্তির মধ্যেই এটাই ছিল গভীরতম। বাদ বাকি ১৪টি কুয়া বসানো হয়েছে ১৫০ ফুট মাটির নিচে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এ ব্রিজের জন্য যে রিভার ট্রেনিং ব্যবস্থা আছে তাও পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। ব্রিজটি অপূর্ব সুন্দর ও আর্কষণীয় হওয়াতে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ইনচীফ রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ স্যার উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনী ব্রিজটির ওপর একাধিক বোমা বর্ষণ করে এর ফলে পিলারের ওপর থেকে ১২ নং স্প্যান (গার্ডার)টির এক প্রান্ত নদীর মাঝে পড়ে যায়। ৯ নং স্প্যানটির নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী ব্রিজটিতে বোমা বর্ষণ করে। পাক বাহিনীকে দক্ষিণ বঙ্গে প্রবেশ না করতে দেয়ার কৌশলগত কারণে পিলারের ওপরে এবং গাডারের নীচে ডিনামাইন্ড বসিয়ে ওপর থেকে বোমা মেরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর যে বোমা দ্বারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ক্ষতিসাধন করা হয় তা এখনো পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারের কার্যালয়ের সামনে সংরক্ষিত রয়েছে।

পরে ব্রিজটি মেরামত করে ভারতের পূর্ব রেলওয়ে শ্রী এইচকে ব্যানার্জী, চীফ ইঞ্জিনিয়ার শ্রী আরকে এসকে সিংহ রায়, ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার শ্রী পিসিজি মাঝি, এ্যাসিসন্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার এছাড়াও বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে ছিলেন রেলওয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার ইন চীফ ইমাম উদ্দিন আহমেদ, ডিভিশনাল সুপার এম রহমান প্রমুখ। মেরামতকৃত গার্ডারটি বর্তমানে কিছুটা দেবে গেছে, ফলে ট্রেন ইঞ্জিনের চালকরা গাড়ির গতি কমিয়ে ব্রিজ পার হয়। ব্রিজটি ১৯১২ সালে স্থাপন অনুযায়ী বর্তমান ২০২০ সালে ১০৮ বছর বছরপূর্ণ করেছে।

বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১০০ বছরের গ্যারান্টি দিয়েছিল যে, এ সময়ের মধ্যে ব্রিজটির কোন প্রকার পরিবর্তন ঘটবেনা সত্যিই তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি। উদ্বোধনের পর বর্তমানে ১০৬ বছর পার হল ব্রিজটির বয়স। ১০৬ বছর অতিবাহিত হলেও সেই যৌবন নিয়েই ব্রিজটি আজও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।

error: কাজ হবি নানে ভাই। কপি-টপি বন্ধ