অসংখ্য হারিছার পুনর্জাগরণ হোক, নামটি হোক অনুপ্রেরণা

সাদিয়া আফরিন হারিছা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়া বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মেধাবী এ শিক্ষার্থীকে ঘিরে বেশ কয়েকদিন ধরে সরব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া হারিছা এখন সমাজের অনেকের কাছেই এক অনুপ্রেরণার নাম।

কীভাবে দারিদ্র্যতাকে জয় করে জীবনে সফলতা বয়ে আনা সম্ভব সেটিই করে দেখিয়েছেন হারিছা। সেই পথ ধরেই তিনি এখন স্বপ্ন বুনছেন একজন মানবিক তথা গরিবের চিকিৎসক হওয়ার।

আর এ অদম্য আত্মবিশ্বাসী হারিছাই যেন হয় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা, সেটিই এখন প্রত্যাশা সবার। সেই প্রত্যাশীদের একজন চট্টগ্রামের অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী শিক্ষক সুলতানা কাজী। হারিছার দারিদ্রতা জয় ও সফলতা যেন শক্তি সঞ্চার করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে, ফেসবুকের একটি গ্রুপে নিজের দেয়া পোস্টে সেটিই তুলে ধরেন তিনি।

সেখানে এ শিক্ষক লেখেন- অদম্য মনোবল ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্পে হারিছা আমার চোখে বিস্ময়! প্রযুক্তির প্রসার ও আধুনিকতার উর্ধগামীতার এ যুগে হারিছার গল্প অনন্য। একজন দিনমজুর রিকশাচালকের মেয়ে বলে নিজেকে পরিচয় দিতে একফোঁটা কুণ্ঠিত নয় সে। তার বলা কথাগুলো আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি শুধু। এত সুন্দর বাচনভঙ্গি, শব্দের গাঁথুনি প্রত্যেকটা বাক্যে, আমি হতবাক! স্যাল্যুট, মা তোকে।

উচ্চমাধ্যমিকের পর ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে লক্ষ্যে পৌঁছানোর দারুণ এক প্রতিযোগিতা থাকে। সবাই চায় তার অভিষ্ট লক্ষ্যে যেতে। কিন্তু হারিছার মতো পান্তাভাত খেয়ে পুরো দিন কেটে কঠোর সাধনার কথা, এখন আর শোনা যায় না! এখন শোনা হয় না খুব ভোরে উঠে কোনো স্টুডেন্ট মনোযোগ দিয়ে পড়ার গল্প! আমিও শুনিনি।

ক্লাস সেভেন থেকেই টিউশন করে নিজের পড়ার খরচ নিজে বহন করার গল্প! এমন গল্প হারিছার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। মা-বাবার পেশা পছন্দসই না হওয়ায়, আমার এক স্টুডেন্ট মিথ্যে পেশা বানিয়ে বলেছিল দু-এক বছর আগে! আমি যখন সত্যটা জানি, অনুনয় করে বলেছিল, আমি যেন কাউকে না জানাই! অথচ ভবিষ্যতের এক মহান ডাক্তার, তার বাবার পেশা বলছে বুকে হাত রেখে সগর্বে।

ইন্টারনেটের দ্রুত প্রসারের এ যুগে, বাবা-মাকে বলতে শোনা যায় রাতে ফোন সার্চিংয়ে ব্যস্ত থাকায় ঘুমাতে পারে না সন্তান। দিনকে তারা তাই রাত বানিয়ে বেঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। আচ্ছা হারিছার মতো এত মেধাবী একজন মেয়ে কোন ব্র্যান্ডের অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করতো? কোন প্রতিষ্ঠান থেকে এত সুন্দর কথা বলা শিখেছে ও? কতটা টিউটর ছিল ওর? গল্প বলায় সে রাষ্ট্রপতি থেকে পুরস্কার নিয়েছে দেশসেরা হিসেবে! পড়ালেখার ক্ষতি হয়নি ওর? এত এক্সট্রাকারিকুলারে জড়িত ছিল সে! কে তাকে এতটা পথ দেখিয়েছে? তার মা-ও তো হয়তো নিরক্ষর, তাহলে?

হারিছা আসলে আমাদের পথ দেখানোর জন্যই জয়ী হয়েছে শুধু। সমগ্র দেশের মানুষদের শিক্ষা দেওয়ার জন্যই হারিছার জয়। অন্ধকারে ডুবে আছি বলে সে আমাদের আলোর কাতারে আহ্বান করছে। জাগা না জাগা, আমাদের ব্যাপার। আমরা আমাদের সন্তানদের পান্তাভাতে অভ্যস্ত করতে পারি। খুব ভোরে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। নিজের পড়ার মাঝেও অন্যদের পড়াতে সুযোগ করে দিতে পারি।

সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত করতে পারি। হীনমন্যতাকে দূরে ঠেলে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান প্রদর্শনের দীক্ষা দিতে পারি। নিজের সংকল্পে বদ্ধপরিকর থেকে সামনের বাধাকে অতিক্রম করার মানসিকতা রোপণ করতে পারি! পৃথিবীতে হারিছার মতো অসংখ্য হারিছার পুনর্জাগরণ হোক। অভাব অনটনকে পিছে ফেলে আজকে হারিছার জয়মাল্য শুধু হারিছার নিজের নয়, সারা বাংলার আপামর জনসাধারণের। জয়তু হারিছা। জয়তু নারীকূল।

সাদিয়া আফরিন হারিছা এমবিবিএস (শিক্ষাবর্ষ ২০২১-২২) ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেন। এছাড়া ২০১৭ সালে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপস্থিত বক্তৃতায় জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয়, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় এবং বিএফএফ সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব এবং রচনা প্রতিযোগিতায় বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব ও ২০১৮ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। হারিছা একাধিক বিষয়ে বিভাগীয় ও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে বরিশাল এবং বানারীপাড়াকে আলোকিত ও গৌরবান্বিত করেন।