হঠাৎ ইউনিভার্সাল ফুড বন্ধ ঘোষণা, পাওনাদারদের ঘেরাও!

হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করা হলো পাবনার টেষ্টি স্যালাইনের জন্য জনপ্রিয় খ্যাত ইউনিভার্সাল ফুড লিমিটেড। কোনও পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় বিপাকে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

বিপাকে পেড়েছেন কোম্পানির ডিলাররাও। সারা দেশ থেকে পাবনায় জড়ো হয়ে বুধবার (১১ মে) কোম্পানির পাবনার শহরস্থ প্রধান কার্যালয়, কারখানা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বাসভবনে ঘেরাও করেছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত ডিলার মালিকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে পাবনা শহরের আতর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শূটার মোবারক হোসেন রত্ব সিনেমা হল ব্যবসার পাশাপাশি ইউনিভার্সাল ফার্মাসিটিউক্যালস ও ফুড লিমিটেডের যাত্রা শুরু করেন। কয়েক বছরের ব্যবধানেই ইউনিভার্সাল ফুড লিমিটেডের উৎপাদিত টেস্টি স্যালাইন নামের একটি পণ্য বাজারে ভোক্তাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ক্রমেই জনপ্রিয়তা পায় এই পণ্যটি।

২০০৭ সালের ১৯ মার্চ মোবারক হোসেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন মোবারক হোসেন রত্ন’র ২য় স্ত্রী সোহানী হোসেন। এ সময় মোবারক হোসেন রত্ন’র পরিবারের ১ম স্ত্রী ও তার বোনদের বিতর্কিত ভাবে প্রাপ্ত সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলে নেয়ারও অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে আদালতেও দীর্ঘদিন মামলা মোকদ্দমাও চলছিল। দায়িত্ব নিয়েই সোহানী হোসেন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসাটি সম্প্রসারণ করেন। স্যালাইনের পাশাপাশি গুড়া মসলা, চানাচুরসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করেন। এ সময় তিনি এই ব্যবসার পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনাসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন।

আরও জানা গেছে, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ইউনিভার্সাল গ্রুপের ২৭০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ১২টি মামলা করেন তৎকালীন রাজশাহী বিভাগীয় কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের এক কর্মকর্তা। বিভিন্ন স্থানে তদবির করেও বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় এই জরিমানার টাকা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। এ সময় দেশের বিভিন্ন বড় বড় ডিলারদের নিকট থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানী হোসেন নিজে ফোন করে প্রতিষ্ঠানটি বাঁচিয়ে রাখতে কোটি কোটি টাকার অগ্রিম টিটি গ্রহণ করেন। এসব টাকার বিনিময়ে প্রদেয় পণ্য বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে গত রমজান মাসে বাজারে টেষ্টি স্যালাইনের চাহিদা ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিলাররা বার বার পণ্যের জন্য চাপ দিয়েও ব্যর্থ হন। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অব্যবস্থাপনার বিষয়টি ডিলারদের কাছে প্রকাশ পায়। ফলে ঈদের পর ব্যবসায়ীরা পাওনা টাকা ফেরত নিতে চাপ প্রয়োগ করলে তারা নানা প্রকার তালবাহানা শুরু করেন। এরই প্রেক্ষিতেই বন্ধ ঘোষণা করা হয় কোম্পানি।

অতি গোপনে ইউনিভার্সাল ফুড লিমিটেডটি বন্ধ ঘোষণা করা বিপাকে পড়েন ডিলাররা। বন্ধের খবর পেয়ে সারা দেশ থেকে পাবনায় ছুটে আসেন দক্ষিণাঞ্চলের ১৬ জেলার ডিলাররা। তারা বুধবার (১১ মে) দুপুর থেকে ইউনিভার্সাল ফুড লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়, কারখানা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন।

এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউনিভার্সেল গ্রুপের বাংলাবাজার এলাকার রুপকথা ইকো রিসোর্টে বৈঠকে বসার জন্য ডেকে নেয়া হয়। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইউনির্ভাল ফুড লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে ডিলারদের সমঝোতা বৈঠক হয়। সেখানে ডিলারদের নিকট এক মাসের মধ্যে সকল পাওনাদি পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দেন সোহানী হোসেন। অধিকাংশ ডিলাররা তাদের পাওনা টাকা আদৌ ফেরত পাবেন কিনা সন্দিহান হলেও মানবিক বিবেচনায় সেখান থেকে বের হয়ে আসেন।

রাজবাড়ী থেকে আসা আক্তার স্টোরের স্বত্তাধিকারী ডিলার আখতার খান, কুষ্টিয়ার শাহাদৎ স্টোরের মালিক শাহাদৎ হোসেন ও ঝিনাইদহের এমএম এন্টারপ্রাইসের মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, টেষ্টি স্যালাইনের মৌসুম শুরুর আগেই নানা ভাবে কৌশলে কোটি কোটি টাকা নিয়ে তারা মালামাল সরবরাহ করেননি। এমডির স্বেচ্ছাচারিতায় ইউনিভার্সালের ব্যবসায়িক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইউনিভার্সাল ফুডের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ব্যবসায় লোকসান দেখিয়ে আমাদের অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা করছেন। কারখানা বন্ধের খবর পেয়ে আমিসহ আমার এলাকার অনেক ডিলার টাকার জন্যে পাবনায় এসেছি।

চুয়াডাঙ্গার চান্নু স্টোরের মালিক সালাহ উদ্দিন চান্নু বলেন, গত ডিসেম্বরে ইউনিভার্সালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানী হোসেন আমাকে টাকার কথা বললে আমি এক কোটি ১১ লক্ষ টাকার টিটি প্রদান করি। অথচ পুরো মৌসুমে আমাকে ১১ লাখ টাকারও মালামাল দেননি এই প্রতিষ্ঠান। আমি নিরুপায় হয়ে টাকার জন্যে পাবনায় এসেছি। আমার পথে বসার মতো অবস্থা হয়েছে।

এবিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসাব কর্মকর্তা শাহীন আক্তার ও কারখানা ব্যবস্থাপক এমদাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মন্তব্য দিতে অস্বীকার করেন। এছাড়াও ইউনিভার্সাল ফুড লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানী হোসেনের মুঠোফোনে বার বার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।