রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় খালেদা জিয়া!

সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব মিটে গেছে। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র শক্ত হাতে নস্যাৎ করেছেন। দলকে রাখতে পেরেছেন ঐক্যবদ্ধ।

নেতৃত্ব পাওয়ার পর দূরদর্শিতা দিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে সব ধরনের রাগ-ক্ষোভ দূর করে সিদ্ধান্ত মানার উপযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রতিদিনই তিনি যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

এমন কার্যক্রমে সন্তোষ তরুণ প্রজন্মও। বিগত কয়েক বছর জ্যেষ্ঠরাও সিদ্ধান্ত পরামর্শ নিয়ে কেউ আর প্রশ্ন তুলছেন না। চলমান কার্যক্রমে ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আস্থা রেখে তাকেই ভবিষ্যৎ নেতা বানাচ্ছেন খালেদা জিয়া। এখন থেকেই কৌশলে দলের সব ধরনের সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছেন।

গত ২৫ মার্চ  শর্ত নিয়ে ছয় মাসের মুক্তির পর থেকেই তিনি এখন গুলশানের বাসায় আছেন। পেরিয়ে গেছে তিন মাসেরও বেশি সময়। এখনো জনসম্মুখে আসেননি। দূরত্ব বজায় রেখেছেন দলের সঙ্গেও। করোনা ইস্যুসহ সাময়িক প্রেক্ষাপটে কোনো বক্তব্য-বিবৃতিও পাওয়া যায়নি অন্যতম রাজনৈতিক দলের এই নেত্রীর।

যদিও মামলার সাজা নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে সহসাই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারছেন না। দলের শীর্ষ পর্যায়ের মাধ্যমে তার কোনো বার্তাও এখনো দেশের মানুষ জানতে পারেনি। বিশেষ করে করোনায় দলের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু কিংবা দেশের পরিস্থিতির ওপর খালেদা জিয়ার স্থলে সব বার্তাই এসেছে তারেক রহমানের নামে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, রাজনীতিতে নীরবে পরিবার-তান্ত্রিকভাবে তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছেন খালেদা জিয়া। এতদিন তার নীরবতার সিগন্যালে তারেকই যে ভবিষ্যৎ নেতা, দলে এখন তা স্পষ্ট।

এ জন্যই পূর্ব পরিকল্পনায় দলের মধ্যে হঠাৎ জ্যেষ্ঠদের টপকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয় তাকে। জ্যেষ্ঠ নেতারাও বুঝতে পারেন অভিজ্ঞতার ঝুলি তাদের যতই বড় হোক না কেন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারেকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। তারাও নির্বিবাদে তারেকের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে শুরু করেন।

জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় আটক হওয়ার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বিচারে যদি খালেদার জেল হয় তাহলে লন্ডনে থাকা পুত্র তারেক রহমানেই দলের সর্বোচ্চ নেতা হবেন। তার পরামর্শ নিয়ে স্থায়ী কমিটি দল চালাবে। ওই দিন খালেদা জিয়া বলেছিলে, ‘আমি যেখানেই থাকি, আপনাদের সঙ্গেই আছি।’

সেই ফর্মুলায় এতদিন দল চলছে। যদিও দলের একটি অংশের দাবি ছিলো, খালেদা জিয়া কারাগার থেকে জীবিত বের হোক এটা তারেক জিয়াও চাননি। ভবিষ্যৎ ক্ষমতার লোভে মায়ের মায়াও তুচ্ছ ছিলো। এ জন্যই আন্দোলন ছক থাকলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের করুণায় খালেদা জিয়া শর্তে মুক্তি পান।

এ ছাড়া শুরু থেকেই সিনিয়রদের মধ্যে তারেকের যে দূরত্ব ছিলো তা ইতোমধ্যে দূর হয়ে গেছে বলে মনে করছেন খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠজনরা।

তাদের মতে, ২০০২ সালে যখন তারেক রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়, এরপর ২০০৯ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০১৬ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, তখন পর্যন্ত তারেক রহমান শুধু পরামর্শ দিতে পারতেন, সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন না।

কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি  যখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়, এরপর থেকে তিনি নেতৃত্বে চমক দেখান। সিনিয়রদের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন। একটি অংশ তারেকবিরোধী মনোভাব দেখালেও শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার অবস্থানে সবাই নীরব হয়ে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারবন্দি থাকাবস্থায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাংগঠনিক দক্ষতা মূল্যায়ন করছেন খালেদা জিয়া। দলের সিনিয়র নেতা, মধ্যম সারির নেতা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলায় তারেক রহমানের কর্মফল পৌঁছে যায় খালেদার কাছে।

দলের স্থায়ী কমিটির মিটিংসহ গুরুত্বপূর্ণ সভা-সেমিনার স্কাইপিতে সমন্ধতায় এবং সংগঠনের নেতাকর্মীদের মনোবল শক্ত রাখতে তার প্রচেষ্টার ওপর খুশি হয়েছেন মা খালেদা জিয়া। এতদিন বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্ব মানতে নাখোশ থাকলেও সমপ্রতি খালেদা জিয়ার মনোভাব জানতে পেরে সবাই এখন তারেকমুখি হয়ে গেছেন।

তবে এখনো ঐক্যফ্রন্টের কিছু সিনিয়র নেতা চান না তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে আসুক। ফ্রন্টের কারা তারেকের ওপর অসন্তোষ তার একটি বায়োডাটা মাহমুদুর রহমান মান্নার মাধ্যমে খালেদা জিয়া পেয়েছেন বলেও একটি সূত্রের দাবি। তবে নির্বাচন রাজনীতির জন্য এখনি ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দূরত্ব চান না খালেদা জিয়া।

রাজনীতিতে তারেকের উঠে আসা বিষয়ে জানতে চাইলে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত পারিবারিক গণ্ডির বাইরে তারেক রহমানের তেমন কোনো পরিচিত ছিলো না। ১৯৮১ সালের মে মাসে আরেকটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় নিহত হন জিয়াউর রহমান। এর মধ্যেই প্রথমবারের মতো তারেক রহমানের কথা জানতে পারেন দেশবাসী।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আন্দোলন করার জন্য বিএনপির সামনে তেমন কোনো বড় রাজনৈতিক ইস্যু ছিলো না। ঠিক তখনই তরুণ নেতৃত্ব ও দলের কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনার নামে ৩৪ বছর বয়সি তারেক রাজনীতির ময়দানে ঢোকেন।

গুলশানে হাওয়া ভবন নামে একটি দোতলা বাড়িতে নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি তার কার্যালয় খোলেন। কিন্তু খুব শিগগিরই হাওয়া ভবন নামটি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সন্ত্রাসের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়।

এই কার্যালয়ে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাবেক রাষ্ট্রদূত, সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিএনপির রাজনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝানো শুরু করেন।

বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, আওয়ামী লীগকে মোকাবিলায় কী কী করণীয় বা ভোটারদের মন জয় করতে কেমন কর্মসূচি দেয়া উচিত, এসব ব্যাপারে তাদের মতামতও নিতেন তারেক।

দেশের বাইরে থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হয়েছে তারেকের ছকে। খালেদা জিয়া আটকের পর নীরব থাকার কৌশলও গ্রহণ করেন তারেক। তিনি চেয়েছেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার আসনে যাতে কোনো কাঁদা না লাগে। এ জন্য আন্দোলনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। তবে দল ভাঙার ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ঐক্য অটুট রাখার দক্ষতা প্রকাশ করেছেন।

তারেক রহমানের সামপ্রতিক ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আমার সংবাদকে বলেন, ‘সারা দেশে বিএনপির কর্মকাণ্ডে যে ভাবে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বের কারণে। এই করোনা ইস্যুতেও ঘরে ঘরে মানুষের পাশে থাকার ভূমিকা দেখিয়েছেন তিনি।

অনেক দূরে নির্বাসিত থেকেও তিনি মানুষের কথা যেভাবে ভাবার দরকার সেভাবেই ভেবেছেন। তিনি কর্মী বান্ধব একজন নেতা। সবার ভাষা বুঝেন। সকল সমস্যার মীমাংসা করে ফেলতে পারেন।

জনগণের ভাবনা দলের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারেন। চমৎকার যোগ্যতা তারেক রহমানের। দলকে সঠিকভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য আমরা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাই। ভবিষ্যতে তার হাত ধরেই এ দেশের মানুষের এবং রাজনীতির পরিবর্তন আসবে।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দক্ষভাবে দল পরিচালনা করেছেন। তার নেতৃত্ব সবাইকে আকৃষ্ট করেছে।  তিনি  রাত দিন সব সময় সঠিকভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন।

 দলের সবাই সন্তুষ্টি। কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, এখনো নিয়মিত করে যাচ্ছেন। দলের দুর্দিনে তারেক রহমানের নেতৃত্ব দলকে সুসংগঠিত ও  শক্তিশালী করেছে। আমরা সবাই তার নেতৃত্বে খুশি।