যেকারণে যেভাবে পুনর্গঠন হবে ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি

আন্দোলন, সাংগঠনিক ও নির্বাচনি কার্যক্রম সব ক্ষেত্রেই কার্যত ব্যর্থ হয়েছে । রাজনীতিতে ‘ভাইপন্থী অনুসারী প্রথা’, ‘বহিরাগতদের’ নেতৃত্বে বসানো, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জবাবদিহিতা না থাকা ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে এসব বিষয় সামনে রেখে নগর কমিটির সংস্কারের চিন্তা করছে বিএনপি। ইতোমধ্যে দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও নগর কমিটির সংস্কারের প্রস্তাব আসছে।

বিএনপির নেতারা বলছেন,  বিগত এক দশক থেকে ঢাকা মহানগর কমিটির নেতৃত্বে যারা এসেছেন প্রত্যেকে নিজের অনুসারী সৃষ্টি করেছেন। বর্তমান নগর কমিটিও সেই ‘ভাই পন্থী অনুসারী প্রথা’র রাজনীতি বহাল রেখেছে। সবার আগে এই প্রথার সংস্কার করে সবাইকে বিএনপির নেতাকর্মী পরিচয়ে দাঁড় করাতে হবে। এরপর ঢাকার স্থানীয় নেতাদের পরবর্তী নগর কমিটির নেতৃত্বে আনতে হবে। কারণ ঢাকার স্থানীয় নয় এমন ‘বহিরাগত’ নেতাদের দিয়ে কমিটি হলে আন্দোলন ও নির্বাচনে সফলতা আসে না। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক সক্রিয় এমন কাউকেও নেতা বানানো যাবে না। স্থানীয় ভোটার এমন ব্যক্তিকে থানা এবং ওয়ার্ড কমিটিগুলোতে নেতৃত্বে বসাতে হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গোপনে আতাঁতকারী নেতাকর্মীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলেই আন্দোলন ও নির্বাচন সব ক্ষেত্রেই সফলতা আসবে। এছাড়া নগরের দুই কমিটিকে সমন্বয় করার জন্য দলের স্থায়ী কমিটির নেতৃত্বে ছোট পরিসরে আরেকটি কমিটি গঠনের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে দলের মধ্যে। 

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঢাকা মহানগর কমিটির যেসব বিষয় সংস্কারের প্রস্তাব উঠেছে এগুলো আমাদের দলের নিজস্ব ব্যাপার। এরমধ্যে কিছু বিষয় এখন হবে, কিছু বিষয় পরবর্তীতে কাউন্সিলের সময় হবে এটাই স্বাভাবিক। এটা চলমান বিষয়।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, যে কোনও সংস্কারকে আমরা স্বাগত জানাই। দলের প্রয়োজনে সব ধরণের সংস্কার হতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস দলের পক্ষ থেকে নগর কমিটির কাছে এমন কোনও সংস্কার প্রস্তাব আসবে না যার বাস্তবতার সঙ্গে কোনও ভিত্তি নেই।’

তিনি বলেন, ভাইপন্থী অনুসারী তৈরির রাজনীতি আমি করি না। আমাদের কাছে সব নেতাকর্মী সমান। বিএনপির রাজনীতি আমার রাজনীতি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি নির্বাচনের  ফলাফলের ভোটে দেখা গেছে, কোনও-কোনও ভোটকেন্দ্রে দলের মেয়র প্রার্থী ভোট পেয়েছে কম আর কাউন্সিলর ভোট বেশি। আবার কোথাও মেয়র প্রার্থী ভোট বেশি পেয়েছে আর কাউন্সিলর প্রার্থী কম। এর কারণে স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে গোপনে আঁতাত।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর বিএনপির কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে প্রস্তাব দিয়েছে গত সিটি নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণের দলটির প্রার্থী ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচন করতে গিয়ে আমি নগর বিএনপির আভ্যন্তরীণ যেসব দুর্বলতা আমার চোখে পড়েছে, তা নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি তখন আমাকে একটা প্রস্তাবনা দিতে বলেছেন। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে সমস্যা এবং তার সমাধান কিভাবে করা তা নিয়ে প্রস্তাবনা তৈরি করেছি। শুধু কেন্দ্রভিত্তিক রাজনীতি নয়, ওয়ার্ড পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। আমার প্রস্তাবনার মধ্যে আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়ে যেমন প্রস্তাবনা আছে, তেমনি নির্বাচন কেন্দ্রীয় সফলতার বিষয়ে প্রস্তাবনা রয়েছে। কারণ গণতান্ত্রিক দল হিসেবে ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে নির্বাচন।

তিনি আরও বলেন, কাউকে ধরে বানিয়ে দিলে তো হবে না, নেতাকর্মীদেরও তাকে নেতা হিসাবে মানতে হবে। যে কোনও সংকটেই নেতা বের হয়। আমার নিজের নেতা হওয়া কোনও ইচ্ছা নেই। দলের প্রয়োজনেই আমার সংস্কারের প্রস্তাব। 

২০১৭ সালে ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুইভাগে ভাগ করা হয়। হাবিব-উন নবী খান সোহেল ও কাজী আবুল বাশারকে যথাক্রমে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং আবদুল কাইয়ুম ও আহসান উল্লাহকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরমধ্যে কমিটির গঠনের আগে থেকেই বিদেশে ‘পলাতক’ হত্যা মামলার আসামি কাইয়ুম। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই মেয়াদী এই কমিটির শেষ হয়ে গেছে ১ বছর আগে।

বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক দুই নেতা মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা প্রথম বিএনপিতে ‘ভাইপন্থী অনুসারী’ সৃষ্টি করেন। সেই থেকে নগর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত। বর্তমান ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ বিএনপির নেতাকর্মীরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীরা প্রধানত মির্জা আব্বাসপন্থী, হাবিব-উন নবী খান সোহেলপন্থী, ইশরাক হোসেনপন্থী (সাবেক সাদেক হোসেন খোকাপন্থী), ও আবুল বাশারপন্থীতে বিভক্ত। আর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাকর্মীরা আবদুল কাইয়ুমপন্থী, সদ্য প্রয়াত আহসান উল্লাহপন্থী এবং আবদুল আউয়াল মিন্টুপন্থীতে বিভক্ত। এর বাইরেও ঢাকার বিভিন্ন নির্বাচনি আসন কেন্দ্রীকও নেতাকর্মীরা বিভক্ত রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঢাকা-৮ সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু এবং ঢাকা-৫ সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ অনুসারীরা।

হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি থানায় সমস্যা ছিল। সেগুলোর সমাধান করছি। এখন কিন্তু কোনও নেতাকর্মী বসে নাই, সবাই সাংগঠনিক কাজে যুক্ত আছে। আমাদের কাছে কোনও পক্ষ-বিপক্ষ নেই।

গত ২২ জুন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয় সংগঠনের সহ-সভাপতি আবদুল আলীম নকিকে। অভিযোগ রয়েছে, তাকে গঠনতন্ত্র বহির্ভূত ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুবরণ করলে বা কোনও কারণে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকে দায়িত্ব পালন করবে।

এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, দলের যে কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে বিএনপির চেয়ারপারসনের। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সেটা গ্রহণ করে থাকেন। ফলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে নাকি উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এখানে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন হয়নি। এমনিতে চিরাচরিত নিয়ম সভাপতি ও সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে তার পরবর্তীতে সিনিয়র ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করে।

সংগৃহিত- বাংলাট্রিবিউন