পাবনায় দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পরিবারের খোঁজ পেলেন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী

প্রায় ৫ বছর আগে মানসিক ভারসাম্যহীন মনোয়ারা খাতুন ওরফে আনোয়ারার (৫৩) দিনমজুর স্বামী কাছু মিয়া মারা যান। এরপর ছোট বোনের বাড়িতে থাকতেন। কিন্তু প্রায় ২ বছর আগে তিনি হারিয়ে যান। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও না পেলে স্বজনরা আশা ত্যাগ করেন।

এরই মধ্যে একদিন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন আনোয়ারা। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দায়িত্ব নেয় তাঁর। সেবা-শুশ্রূষার পাশাপাশি তাঁর বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করেন সংগঠনের সদস্যরা। এরপর তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয় পরিবারের কাছে।

আনোয়ারার নারীর বাড়ি সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের বাদে হরিপুর গ্রামে। নিখোঁজের প্রায় দুই বছর পর তিনি গত ১২ ডিসেম্বর সকালে পাবনার পাকশী ইউনিয়নের রুপপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পাবনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

পাবনা জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোববার সকাল সোয়া সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রওনা হয়ে ওই দিন বিকেল চারটার দিকে আনোয়ারাকে ধরমপাশা উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হয়। এ সময় উপজেলা সহকারী কমিশনার মো. আবু তালেব, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দিন, জয়শ্রী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরীর উপস্থিতিতে আনোয়ারার ছোট বোন সাহানার হাতে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

সেখান থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনারের সরকারি গাড়ি করে জয়শ্রীবাজার পর্যন্ত নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে একটি নৌকায় করে বাদে হরিপুর গ্রামে সাহানা আক্তারের বাড়িতে পৌঁছে দেয় উপজেলা প্রশাসন। নিখোঁজের দুই বছর পর আবার ফিরে আসায় শত শত উৎসুক মানুষ তাঁকে দেখার জন্য ভিড় করছেন বাড়িতে।

সাহানা আক্তার (৩৫) বলেন, ‘আমার বইনডার জামাই মরছে হাছ (৫) বছর অইছে। হের একডা মাইয়া আছে। হেরে আমরা কয়েক বছর আগেই বিয়া দিয়া দিছি। বইনডার মাথায় কিছুডা দুষ আছিইন। দুই বছর অয় হে আরাইয়া গেছিইন। অহন হেরে আমি হিরত ফাইছি। যারা হেরে আমার কাছে হিরইত দিছইন আল্লায় তাঁরারে ভালা করবাইন।’ এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, ১২ ডিসেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ওই নারীকে পথচারীরা ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। বিকেলে খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, ওই নারীর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশটি ভেঙে গেছে। এই হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতালে সমাজসেবা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হয়।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, গত ২৯ ডিসেম্বর ওই নারীর অস্ত্রোপচার করা হয়। ৯ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। জনসচেতনা তৈরির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইয়েলো ল্যাম্পের সদস্যরা ওই নারীকে বাসা থেকে হাসপাতালে খাবার এনে খাওয়ানোর ব্যবস্থাসহ একজন আয়া রেখে তাঁকে পরিচর্যার ব্যবস্থা করেছেন। চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁরাও যোগাযোগ রেখেছেন।

ইয়েলো ল্যাম্প সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, মানসিক ভারসাম্যহীন আহত নারী নিজের সঠিক নাম–ঠিকানা বলতে পারছিলেন না। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে সুনামগঞ্জ ও একজন চেয়ারম্যানের নাম বলতে পেরেছিলেন। নানা জায়গায় সহায়তা নিয়ে ওই নারীর ঠিকানা পাওয়া যায়।

শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সাল থেকে সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাঁরা জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করে আসছেন। তাঁরা লিফলেট বিতরণ, গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের নিয়ে কর্মশালা, নিরাপদভাবে সড়ক চলাচল করার বিভিন্ন নিয়মকানুন বিষয়ে মানুষজনকে নিয়ে আলোচনা করেন। এ পর্যন্ত সংগঠনের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা পরিচয়ধারী ও মানসিক ভারসাম্যহীন ১৭ নারী-পুরুষকে চিকিৎসা–সংক্রান্ত কাজে তাঁরা সহযোগিতা করেছেন।

জয়শ্রীর ইউপি চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরী বলেন, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারীর পাশে দাঁড়িয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যালয় ও ইয়েলো ল্যাম্প এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই মহতী কাজের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ওই সংগঠনকে একটি ধন্যবাদপত্র দেওয়া হয়েছে।