বের হয়ে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ‘দেখে নেবে’ শাহেদ!

সাতক্ষীরা থেকে গ্রেফতারের পর হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনার পথে র‌্যাব কর্মকর্তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন মো. শাহেদ। র‌্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, হেলিকপ্টারে ওঠানোর পর শাহেদ বলেন, ‘আমাকে কত দিন আটকে রাখবেন? যখন বের হব তখন আপনাদের দেখে নেব।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালে অভিযানের পর থেকেই শাহেদ আর নিজের বাড়িতে থাকেননি। প্রথম দিন তিনি ঢাকায় একটা হোটেলে ছিলেন। পরদিন তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার (পিএস) নরসিংদীর বাড়িতে চলে যান। সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে কক্সবাজার যান শাহেদ। কুমিল্লা ছাড়ার আগে নানাজনকে ফোন করে বাঁচার চেষ্টা করেছেন। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় এসে একটি গাড়ি ভাড়া করে চলে যান সাতক্ষীরায়।

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. শাহেদ ওরফে শাহেদ করিম একের পর এক প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। প্রতারণার শিকার অনেকেই এখন র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করছেন। এ ছাড়া শাহেদ জালিয়াতি করে নিজের নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ারও চেষ্টা করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার শাহেদকে আদালতে হাজির করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ও জাল টাকার আরও দুটি মামলা করেছে র‌্যাব।

গত ৬ জুলাই র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম রিজেন্টের উত্তরা শাখায় অভিযান চালানোর পর বলেছিলেন, রিজেন্ট প্রায় ছয় হাজার নমুনা নিয়ে পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া প্রতিবেদন দিয়েছে। হাসপাতালটি কীভাবে প্রতারণা করেছিল রোগীদের সঙ্গে? খোঁজ নিতে গিয়ে দুটি পরিবারের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। এই দুই পরিবারের ১৪ জনের নমুনা নিয়ে রিজেন্ট জালিয়াতি করেছিল বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

জুনের শেষ সপ্তাহে সড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তার ছেলে ও ছেলের বউয়ের করোনা পরীক্ষা করানো হয়েছিল একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তারা ঘরেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ছেলে রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি হন। একদিন পরই হাসপাতাল ছাড়তে চাইলে রিজেন্ট ৫২ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেয়। তার মধ্যে রক্তের একটি নমুনা থেকে বিলে ১০টি পরীক্ষা করানো হয়েছে বলে দেখানো হয়। এর একটি ছিল ইসিজি। রক্ত থেকে ইসিজি পরীক্ষা হয় কীভাবে জানতে চাইলে রিজেন্ট জানিয়েছিল, এটা সম্ভব।

হাসপাতালে ভর্তির পরই তারা জানতে পেরেছিলেন রিজেন্ট বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। রিজেন্টের লোকজন ২৮ হাজার টাকা নিয়ে ছয়জনের নমুনা সংগ্রহ করে। যে ব্যক্তি নমুনা নিয়ে গেছেন তিনি এমন ভাব করছিলেন যেন ডাক্তার। র‌্যাবের অভিযানের পর তারা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি আসলে রিজেন্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা, নাম তারিক শিবলী।

নমুনা নিয়ে যাওয়ার পর রিজেন্ট তাদের একটি জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচ) স্লিপ দেয়। সরকারি ওই কর্মকর্তা যে কলোনিতে থাকেন, সেখানে আইপিএইচের একজন কর্মকর্তা থাকেন। তাকে স্লিপটি দিতেই ওই কর্মকর্তা বলেন, যে সিরিয়াল দেওয়া হয়েছে ওই সিরিয়ালের নমুনা আইপিএইচে নেই। সন্দেহের মধ্যেই তারা হাতে ফল পান। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করালে সেই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ফল দেখা যায়। কিন্তু এই পরিবারটির ফল দেখা যায়নি। তারা কারণ জানতে চাইলে রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ আবারও লোক পাঠায়। ২৪ ঘণ্টা পর ওয়েবসাইটে তারা ফল দেখতে পান।

একই রকম জালিয়াতির শিকার হয়েছিলেন বড় একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তাদের পরিবারের আটজনের নমুনা নিয়ে গিয়েছিল রিজেন্ট। তারা ওয়েবসাইটে ফল দেখতে পাচ্ছিলেন না এবং রিজেন্টের রিপোর্টও তাদের বিশ্বাস হয়নি। এরই মধ্যে ৩৭ হাজার টাকা নিয়ে যায় রিজেন্ট।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, রিজেন্ট কোনো নিয়মকানুন না মেনে নমুনা পাঠাচ্ছিল, আবার টাকাও নিচ্ছিল। সে কারণে তারা খুব অসুবিধায় পড়ছিলেন। বিষয়টি অধিদপ্তরকে জানানোও হয়েছিল। একপর্যায়ে গত জুনে নিপসম রিজেন্টের নমুনা নেওয়া বন্ধ করে দেয়।

গ্রেফতার হওয়া শাহেদ একাধিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন, এমন আলোচনা ওঠায় নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অনুবিভাগ বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, সাহেদ ২০১৯ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করেন। তাকে এনআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদন করার বছরখানেক আগে শাহেদ একটি নতুন পরিচয়পত্র করতে এসেছিলেন। সে সময় তার আঙুলের ছাপ নেওয়ার পর দেখা যায়, তার নামে একটি পরিচয়পত্র আছে। তাই আরেকটি পরিচয়পত্র করার সুযোগ পাননি।

তবে নাম সংশোধনের জন্য প্রমাণ হিসেবে কেমব্রিজের ও লেভেলের একটি সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদ, নাগরিকত্ব সনদ ও পাসপোর্টের কপি দাখিল করেছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে তার দেওয়া জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ যথাযথ পাওয়া গেছে।