পাবনা-৪ আসনে মনোনয়ন চান প্রয়াত সাংসদের স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে–জামাতা ও ভাগনে!

পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়ক। সড়কের জেলা সদর অংশ শেষ হতেই পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) নির্বাচনী এলাকা। দুই পাশে ঝুলছে বড় বড় বিলবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার। মনোনয়নের প্রত্যাশা করে এসব লাগিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।

তবে এর অধিকাংশই দখল করে রেখেছেন এই আসনের প্রয়াত সাংসদ শামসুর রহমান ডিলুর পরিবারের সদস্যরা। পাবনা-৪ আসনে পরপর পাঁচবার সাংসদ নির্বাচিত হন ডিলু। ফলে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ২২ বছর আসনটি তাঁরই দখলে ছিল। একই সঙ্গে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এই দখল ধরে রাখতে মাঠে নেমেছেন  ডিলুর পরিবারের পাঁচ সদস্য। তবে পরিবারটির হাতে রাজনীতির কর্তৃত্ব আর ছাড়তে রাজি নন আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতা। ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে আসনটিতে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন আওয়ামী লীগের আরও প্রায় ১৫ নেতা। অন্যদিকে চুপচাপ বসে নেই বিএনপি। আওয়ামী লীগের বহু প্রার্থীর হইচইয়ের মধ্যে হাতছাড়া আসনটি ফিরে পেতে মাঠে নেমেছেন বিএনপির নেতারাও। ফলে নির্বাচন কেন্দ্র করে এখন সরগরম হয়ে উঠেছে ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা। বিগত দুই সংসদ নির্বাচন অনেকটা একপক্ষীয় হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে তেমন উত্তেজনা ছিল না। তবে এখন রাজনৈতিক আড্ডা থেকে শুরু করে চায়ের দোকানগুলো উপনির্বাচনের আলাপে সরগরম, চায়ের কাপে ঝড়। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা করোনাভাইরাস নিয়ে সচেতনতা, ত্রাণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এত দিনে একটা নির্বাচনের আমেজ পেতে শুরু করেছে এলাকার মানুষ।

ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন কেন্দ্র করে পুরো উপজেলা সরগরম হয়ে উঠেছে। যারাই মনোনয়ন পাক, নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়, আমরা যেন ভোট দিতে পারি।’

জেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাংসদ শামসুর রহমান শরীফ ডিলু (৮২) গত ২ এপ্রিল ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। গতকাল সোমবার থেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাছে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে।

নির্বাচনী আসনটি শূন্য ঘোষণার পরই উপনির্বাচনে মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন শামসুর রহমান  শরীফ ডিলুর স্ত্রী ও ঈশ্বরদী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুন নাহার শরীফ। তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশা করে পোস্টার-ব্যানারে ভরে দিয়েছেন নির্বাচনী এলাকা। পাল্টা পোস্টার-ব্যানার টাঙিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন তাঁদের বড় ছেলে ও ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গালিবুর রহমান শরীফ। তবে মাকে আসন ছাড়তে রাজি নন তিনি। অন্যদিকে মা ও ভাইকে টপকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বড় বোন ও জেলা আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মাহজেবিন শিরিন এবং তাঁর স্বামী ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদ। একই দৌড়ে অংশ নিচ্ছেন শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর খালাতো ভাই এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বশির আহম্মেদ।

রাজনৈতিক পদ ও পারিবারিক অবস্থা বিবেচনায় মনোনয়নপ্রত্যাশী এই পাঁচ প্রার্থীর সবাই নিজেদের যোগ্য বলে মনে করেন। প্রচার-প্রচারণায় কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কিছু নেতা ছেলে গালিবুর রহমান শরীফকে সমর্থন দিচ্ছেন। কেউবা আবার চাচ্ছেন তাঁদের মাকে।

এ প্রসঙ্গে ছেলে গালিবুর রহমান শরীফ বলেন, ‘আমি ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই আমাকে সমর্থন দিচ্ছেন।’

গালিবের মা কামরুন্নাহার শরীফ বলেন, ‘মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার আমার আছে। দলেও অবস্থান ভালো। আমি মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি।’

গালিবের বোন মাহজেবিন শিরিন বলেন, ‘আমার বাবা ঈশ্বরদী-আটঘরিয়ায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তিনি উন্নয়নের আরও অনেক স্বপ্ন বুনেছিলেন। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই আমি মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি।’

একই কথা পরিবারের অপর দুই প্রার্থীরও। তাঁরাও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রার্থী হতে চান। তবে দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন সবাই।

ডিলু পরিবারে মনোনয়ন নিয়ে রেষারেষি প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম বলেন, ‘শামসুর রহমান শরীর একজন বর্ষীয়ান ও আদর্শবান নেতা ছিলেন। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তাঁর পরিবারের সদস্যরা এভাবে মনোনয়ন চেয়ে পারিবারিক রাজনৈতিক আদর্শকে ধ্বংস করছে।’ তিনি আরও বলেন, দলে বহু যোগ্য নেতা রয়েছেন। তাঁরা এবং তিনি নিজেও মনোনয়ন চাইবেন।

ডিলু পরিবারের বাইরে ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও জেলা সদরের আরও প্রায় এক ডজন আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও দুদকের সাবেক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এস এম নজরুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল রহিম, পাবনা পৌরসভার মেয়র কামরুল হাসান, আটঘরিয়া পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস, ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুজ্জামান বিশ্বাস, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নায়েব আলী বিশ্বাস এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আইনজীবী রবিউল আলম ও মৎস্যজীবী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুল আলিম উল্লেখযোগ্য।

এর বাইরেও আরও অনেকে মনোনয়ন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। অনেকে ত্রাণ বিতরণ, করোনাভাইরাস ঠেকাতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সবার প্রচারণায় সরগরম এই আসন।

মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, দলীয় প্রধান তাঁদের বিষয়ে জানেন। তাঁর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখবেন সবাই।

এদিকে উপনির্বাচনের এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যরাও। দীর্ঘ ২২ বছর আগে হারানো আসনটি ফিরে পেতে নির্বাচনে অংশ নিতে চায় স্থানীয় বিএনপি। দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য সাবেক সাংসদ সিরাজুল ইসলাম সরদার। তাঁরাও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সাবেক সাংসদ মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস, জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি হায়দার আলী।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে এখনো কিছু বলছি না। কেন্দ্রীয় বিএনপি থেকে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তবে দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, নির্বাচনে অংশ নেব।’