ঈদেও ক্রেতাশূন্য হাট! অস্তিত্বহীনের মুখে পাবনার তাঁতশিল্প

সারা বছর যেমন-তেমন গেলেও ঈদকে সামনে রেখে জমজমাট হয়ে ওঠে পাবনার তাঁতি পল্লিগুলো। কিন্তু গত দুইবছর ধরে ঠিক তার উল্টোটা ঘটছে। অলস সময় পার করছেন তাঁতিরা। তাঁতপল্লী গুলো এখন জন মানব শুন্য। ফলে ঈদের বাজারগুলোতও তেমন ভিড় নেই। এদিকে সুতা ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনছেন তাঁতিরা। ফলে উপজেলার অনেক তাঁত এখন বন্ধ।

কাপড় ব্যবসায়ী ও তাঁতিরা জানায়, বছর দুই-এক আগেও পাবনার হাটগুলোতে দেশি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রচুর ভারতীয় ব্যবসায়ী কাপড় কিনতে আসতেন। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের আগে হাটে পা ফেলার জায়গা থাকত না। কিন্তু বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এলেও কাপড়ের হাটগুলোতে ভারতীয় ক্রেতাদের দেখা নেই। হাটে শুধু দেশি কাপড় ব্যবসায়ীদের দেখা মিললেও তাদের সংখ্যা বেশ কম।

পাবনার আতাইকুলা ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কাপড়ের হাট ঘুরে দেখা গেছে, ঈদুল ফিতরের এই ভরা মৌসুমেও ক্রেতাদের উপস্থিতি কম। বেড়ার মৈত্রবাঁধা মহল্লার আক্তার হোসেন ছিলেন শাহজাদপুর কাপড়ের হাটের অন্যতম পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ী। মাসখানেক হলো শাহজাদপুর হাটের তার বড় দোকানটি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে আমার ৫০ লাখ টাকার ওপরে বাকি পড়ে আছে। যাদের কাছে পাওনা, তারা দীর্ঘদিন ধরে হাটে আসেন না।

এদিকে রং, সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় কাপড়ের দামও কিছুটা বেড়েছে। ফলে হাটে বেচাকেনা তেমন নেই। তাই লোকসান টানতে না পারায় বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছি। আমার মতো অনেকেরই একই অবস্থা।’

তাঁতিরা বলেন, গত কয়েক মাসে পাল্লা দিয়ে সুতাসহ বিভিন্ন তাঁত সামগ্রীর দাম বেড়েছে। মাস দুই-এক আগে যে সুতার দাম প্রতি ডোপ (সাড়ে ৮ বান্ডিল) ১৩ হাজার টাকা ছিল, বর্তমানে দাম হয়েছে ২৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে রঙের দামও প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। কিন্তু কাপড়ের দাম খুব একটা বাড়েনি। ৭০০ টাকা দামের প্রতি থান (৪টি) লুঙ্গির দাম বেড়েছে মাত্র ১০০-১৫০ টাকা। এই দামে লুঙ্গি বিক্রি করে তাঁতিদের লোকসান হচ্ছে। ফলে ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে যেখানে নতুন তাঁত চালু হওয়ার কথা, সেখানে উলটো বন্ধ হচ্ছে একের পর এক তাঁত।

সরেজমিনে বেড়া উপজেলার হাতিগাড়া, মালদাপাড়া, পেঁচাকোলা, রাকশা প্রভৃতি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অর্ধেকের বেশি তাঁতঘর বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক তাঁতিই মোটা অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে গ্রাম ছেড়েছেন।

বেড়ার মালদাপাড়া গ্রামের তাঁতি একরাম হোসেন বলেন, ‘আমাগরে গ্রাম আর পাশের পেঁচাকোলা গ্রামে বছরখানেক আগেও হাজার চারেক তাঁত চালু ছিল। এখন অর্ধেকের বেশি তাঁত বন্ধ। আমিও দীর্ঘদিন তাঁত বন্ধ রাখিছিল্যাম। ঈদ উপলক্ষ্যে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়্যা দুইখান তাঁত চালু করিছি। কিন্তু হিসাব কইর্যা দেখতেছি, এই কাপড় বাজারে নিয়্যা আমার লোকসান হবি। তাই তাঁতের থ্যা কাপড় নামার পরই তাঁত বন্ধ কইর্যা দেব।’

এ বিষয়ে নতুনভারেঙ্গা ইউনিয়ন প্রাথমিক তাঁতি সমিতির সভাপতি মো. আলম বলেন, ‘আমার সমিতির ২৫০ জন সদস্যের প্রায় ১ হাজার তাঁত ছিল। এসব তাঁতের মাত্র সিকিভাগ (এক-চতুর্থাংশ) চালু আছে। বাকি তাঁত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুর আলী বলেন, রমজান উপলক্ষ্যে সরকারিভাবে তাদের জন্য এখনো কোনো ধরনের বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।