কালকের টিকিটের জন্য আজ দুপুরেই কাউন্টারে

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ার বাসিন্দা মো. লিটন। গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ঈদ উদ্‌যাপন করতে ৩০ এপ্রিল সপরিবারে বাড়ি যেতে চান। এ জন্য ট্রেনে তিনটি শোভন চেয়ারের টিকিট প্রয়োজন। ৩০ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি শুরু হবে কাল মঙ্গলবার সকাল আটটায়। অথচ আজ সোমবার দুপুরেই রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে হাজির লিটন।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত শনিবার থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনসহ পাঁচটি স্থানে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। আজ ছিল অগ্রিম টিকিট বিক্রির তৃতীয় দিন। সকাল আটটা থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। আজ বিক্রি হয়েছে ২৯ এপ্রিলের টিকিট। কাল বিক্রি হবে ৩০ এপ্রিলের টিকিট।

লিটন বলেন, ‘সড়কে যেতে যানজটসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আর ট্রেনে বাড়ি গেলে কোনো জ্যাম থাকে না। কিন্তু ট্রেনের টিকিট সোনার হরিণ। অনলাইনে কয়েকবার চেষ্টা করেছি। টিকিট পাইনি। টিকিট যেন হাতছাড়া না হয়, এ কারণে এক দিন আগেই স্টেশনে এসেছি।’

পেশায় রাজমিস্ত্রি লিটন সঙ্গে করে একটি চাদর নিয়ে এসেছেন। চাদরটি কাউন্টারের সামনের মেঝেতে বিছিয়ে বসে আছেন। তিনি বলেন, ‘ইফতার করব স্টেশনেই। বাইরে থেকে খাবার কিনে আনব। একইভাবে রাতের খাব, সাহ্‌রিতেও খাব। এখানেই রাতটা পার করে দেব। রাতে এই স্টেশনেই সবার সঙ্গে গল্পগুজব করব। প্রতিবার বাড়ি যাই ট্রেনে। প্রতিবারই এই ভোগান্তি দেখি।’

ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট কিনতে প্রতিদিনই কমলাপুর রেলস্টেশনে কাউন্টারগুলোয় টিকিটপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ স্টেশনে আসেন সাহ্‌রি খেয়ে, কেউবা আসেন আগের দিন রাতে বা বিকেলে। আগের দিন দুপুরে স্টেশনে আসছেন—এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক।

আজ দুপুর ১২টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে ২৯ এপ্রিলের ঈদযাত্রার টিকিট বিক্রি শেষ হয়। এ সময় কাউন্টারগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি কাউন্টারের সামনেই সাত থেকে আটজন টিকিটপ্রত্যাশী দাঁড়িয়ে আছেন। দুটি কাউন্টারের সামনে অন্তত ১৫ জনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা ৩০ এপ্রিলের টিকিট কাটতে স্টেশনের সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন।

তেমনই একজন রাজধানীর শাহজাদপুরের বাসিন্দা রাহাত খান। ২৫ বছর বয়সী এ যুবক কমলাপুর রেলস্টেশনে এসেছেন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এই চাকরিজীবী ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়েছেন।

রাহাত খানের চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেসের টিকিট প্রয়োজন। রাহাত বলেন, ‘আমার চারটি টিকিট প্রয়োজন। এসি বা নন-এসি একটা টিকিট পেলেই হলো।’

রাতে কীভাবে স্টেশনে থাকবেন, জানতে চাইলে রাহাত খান বলেন, ‘পেপার বিছিয়ে বসব। রাতে স্টেশনে বসে আগে পিছের ভাইদের সঙ্গে লুডু খেলব, তাস খেলব। গল্পগুজব করে সময়টা পার হয়ে যাবে।’

কমলাপুর রেলস্টেশনে কাউন্টার আছে ২৩টি। এর মধ্যে দুটি কাউন্টার হচ্ছে নারীদের জন্য। বাকিগুলো পুরুষদের জন্য। কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার বলেন, ‘অন্যান্য বছর নারী ও প্রতিবন্ধীদের একটি কাউন্টারে টিকিট দেওয়া হতো। এ বছর তাঁদের জন্য দুটি কাউন্টার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সবাই সুষ্ঠুভাবেই টিকিট পাবেন এটাই আশা।’ এই ব্যবস্থাপক বলেন, কাউন্টারে যেন কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সে জন্য রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, রেল পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা সহযোগিতা করছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্রিম ঈদযাত্রায় প্রতিদিন ২৭ হাজার ৮৫৩টি অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনলাইনে বিক্রি হবে ১২ হাজার ১৫৭টি এবং কাউন্টারে বিক্রি হবে ১৫ হাজার ৬৯৬টি। ঈদযাত্রা শেষে ট্রেনের ফিরতি টিকিট বিক্রি শুরু হবে আগামী ১ মে থেকে।

‘৫৩ হাজার যাত্রী দৈনিক ঢাকা ছাড়বে’
বেলা ১১টার দিকে ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার। তিনি বলেন, আন্তনগর, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন মিলিয়ে প্রতিদিন ৫৩ হাজার যাত্রী ঢাকা ছাড়তে পারবেন। সে ক্ষেত্রে সব ঘরমুখী মানুষ যদি ট্রেনে যেতে চান, সবাইকে টিকিট দেওয়া কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। ঈদে চাপ পড়বে—এটা জেনেই আন্তনগর ট্রেনে অতিরিক্ত বগি, ঈদ স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ট্রেনের টিকিটে কোটা বরাদ্দ প্রসঙ্গে স্টেশন ব্যবস্থাপক বলেন, করোনার কারণে যে কোটাপ্রথা বাতিল করা হয়েছে, এখনো সেটি বলবৎ আছে। শুধু রেলওয়ের ২ শতাংশ এবং ইমার্জেন্সি ২ শতাংশ কোটা চালু আছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, কাউন্টারে ডিসপ্লে বন্ধ, টিকিট দিতে ধীরগতি হচ্ছে, জাতীয় পরিচয়পত্র সবার যাচাই করা হচ্ছে না। এসব অভিযোগের জবাবে স্টেশন ব্যবস্থাপকের মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ারের দাবি, সব টিকিটপ্রত্যাশীর টিকিট চেক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ কারণে টিকিট কাটতে ধীরগতি হচ্ছে। যাত্রীরা যাতে কাউন্টার থেকেই টিকিট পান, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ডিসপ্লে যাতে খোলা রাখা হয়, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাসুদ সারওয়ার বলেন, যাঁরা টিকিট পাচ্ছেন না অনলাইনে, সে সংখ্যা বেশি। যাত্রীর চাহিদার তুলনায় টিকিট তো সীমিত।

সংগৃহিত- প্রথম আলো