ঈদযাত্রায় কাজিরহাট-আরিচা ঘাট নিয়ে শঙ্কা!

একটা সময় পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের প্রধান প্রবেশপথ ছিল পাবনার কাজিরহাট-আরিচা নৌরুট। বঙ্গবন্ধু সেতু চালু এই নৌরুটে পরিবহনের চাপ বেশ কমে যায়। এরপর আরিচা ফেরি ঘাটটি পাটুরিয়ায় স্থানান্তর হলে বলতে গেলে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুট চলে যায় লাইফ সাপোর্টে। ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরিচা বন্দরের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যসহ সবকিছুই স্থবির পড়ে।

এরপর দীর্ঘ বিরতি। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ফের মানিকগঞ্জের আরিচা ও পাবনার কাজিরহাট নৌরুটে শুরু হয় ফেরি সার্ভিস। তাতে দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার আরও একটি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়। নতুন এই ফেরি সার্ভিস ঘিরে আশায় বুক বেঁধেছিলেন দুই পাড়ের মানুষ। কিন্তু গত এক বছরেও ফেরি সার্ভিসের সেবার মান উন্নত না হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে আশা এবং ভরসার এই ঠিকানাটি।

এই রুটে ফেরি চালু হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সেতুর বিকল্প হিসেবে এই পথে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব কমেছে প্রায় ৯০ কিলোমিটার। স্থানীয়রা বলছেন, ফেরির সংখ্যা বাড়ানো হলে বাঁচবে সময় ও কমবে খরচ। আর কর্তৃপক্ষ বলছে, আসছে ঈদুল ফিতরের আগে নতুন ঘাট চালুর পাশাপাশি নতুন ফেরিও যোগ করা হবে এই নৌরুটে।

দুই পাড়ের অধিবাসীরা বলছেন, গত বছর ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ার পর শুরুর দিকে ভালো মানের কয়েকটি ফেরি নামানো হয়েছিল এই রুটে। তবে কিছুদিন পরই সেই ফেরি গুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। তার বদলে এই নৌরুটে স্থান পায় লক্কর-ঝক্কর মার্কা তিনটি ফেরি। ফেরি স্বল্পতার পাশাপাশি ঘাট স্বল্পতার কারণেও এই রুটে যাতায়াতকারীদের ভোগান্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা এখন চরম দুর্ভোগের শিকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পারাপারের অপেক্ষায় ঘাটেই পড়ে থাকতে হচ্ছে তাদের।

যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, একটি ফেরির জন্য র্তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হয় যমুনার নদীর দিকে। দুর্বল ও পুরনো ফেরির কারণে আরিচা থেকে কাজিরহাটে যেতে সময় লাগছে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত। ফেরি সংকটের কারণে এই রুটে পণ্যবাহী ট্রাক আর ছোট গাড়ি অর্থাৎ প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস চলাচল করলেও বড় বাসগুলো পুরোপুরি চলাচল করছে না। কাজিরহাটে মাত্র একটি ঘাট সচল থাকায় সেখানে যানজটের মাত্রা আরও বেশি থাকছে।

ট্রাক চালক আমির হোসেন বলেন, ভাঙাচোরা তিনটি ফেরি দিয়ে কোনো রকমে এই নৌরুটটি চালু রাখা হয়েছে। এই পথে যে হারে পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার হয়ে থাকে, সে হারে ফেরি না থাকায় দুই পারেই দুই-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। এতে আমাদের মতো ট্রাকচালক ও শ্রমিকরা সবচেয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছি।

আরেক ট্রাকচালক রমজান আলী বলেন, কখন ঘাটে ফেরি ভিড়বে, তার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকতে হয়। ঘাট থেকে একটি ফেরি ছেড়ে গেলে আরেকটি ফেরি ঘাটে নোঙর করতে এক দুই-ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। যেখানে দীর্ঘ পথের একটি যোগাযোগ মাধ্যম, সেখানে মাত্র তিনটি ফেরি চালু থাকা যৌক্তিক হতে পারে না। ফলে নামেই কেবল ঘাট চালু হয়েছে। তাতে আমাদের সুবিধার বদলে দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। দীর্ঘ এক বছরেও এই নৌরুটে ফেরি সার্ভিসের মান বাড়েনি। ভোগান্তি কমাতে হলে ফেরি, ঘাট সবই বাড়াতে হবে।

স্থানীয় সাংবাদিক শাজাহান বিশ্বাস বলেন, আমার বাড়ি আরিচা ঘাট এলাকায়। একটা সময় কাজিরহাট-আরিচা নৌরুট ছিল জমজমাট। যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে এই নৌরুটটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ধ্বস নেমে আসে। তার মধ্যে আরিচা ফেরি ঘাটটি স্থানাস্তর করা হয় পাটুরিয়ায়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটের ফেরি সার্ভিস। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর ফের এই নৌরুটে ফেরি সার্ভিস চালু হলে আমরা দুই পারের মানুষই আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু গত এক বছরে ফেরির সংখ্যা বাড়েনি, বাড়েনি সেবার মান। মাত্র তিনটি ফেরি দিয়ে কোন রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে নৌরুটটি। পাশাপাশি ঘাটের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডাব্লিউটিসি) আরিচা ফেরি ঘাটের দায়িত্বরত ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. আবু আব্দুল্লাহ অবশ্য আশা দেখাচ্ছেন ঘাটের পাশাপাশি ফেরির সংখ্যা এবং সেবার মান বাড়ানোর।

তিনি বলেন, গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে যখন কাজিরহাট-আরিচা নৌরুটটি চালু হয়, তখন শুরুতে দুইটি নতুন ও একটি রো রো ফেরি দিয়ে ঘাট চালু হয়েছিল। বর্তমানে একটি নতুন ফেরি থাকলেও দু’টি ফেরি রয়েছে পুরনো। আগে দুই পারে মাত্র দু’টি ঘাট থাকলেও এখন আরও দু’টি ঘাট হচ্ছে। ঘাটগুলোর কাজ শেষ হলে এই রুটে নতুন রো রো ফেরি দেওয়া হবে। আশা করছি, আগামী ঈদুল ফিতরের আগেই নতুন ফেরি দিয়ে ঘাটটি পুরোদমে সচল করা হবে।