করোনার ভ্যাকসিন পেতে যেভাবে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে

চলতি মাসের শেষের দিকে অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে আসতে পারে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিন দেয়ার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করছে সরকার। দেশের নাগরিককে করোনার ভ্যাকসিন পেতে হলে এই অ্যাপে নিজেদের তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

এই অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করার পর সেখান থেকে সরকার টিকা গ্রহীতার সম্পর্কে যেমন সব তথ্য পাবেন, তেমনি যারা টিকা নেবেন, তারাও পরবর্তী আপডেট সম্পর্কে জানতে পারবেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ডা: হাবিবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘মোবাইল ফোনে অ্যাপটি ডাউনলোড করে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে থেকেই রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। অ্যাপটা সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। যারা টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন, তাদেরও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।’

কীভাবে নিবন্ধন হবে?

স্মার্ট মোবাইল ফোনে ডাউনলোডের পর ফোন নম্বর ও এনআইডি নম্বর দিয়ে ব্যবহারকারীরা অ্যাপে নিজেরা নিবন্ধন করবেন। অ্যাপে নিবন্ধন করার সময় নাম, জন্মতারিখ, এনআইডি নম্বর, অন্য কোন শারীরিক জটিলতা আছে কিনা, পেশা ইত্যাদি বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।

তবে কারা আগে টিকা পাবেন, সেই অগ্রাধিকারের তালিকাটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকেও সংগ্রহ করা হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি করোনাভাইরাসের দুটি করে ডোজ পাবেন। তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের বিস্তারিতও অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে। প্রতিবেশী ভারতেও টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে এরকম একটি অ্যাপের ব্যবহার করা হচ্ছে।

কারা আগে টিকা পাবেন

ডা: হাবিবুর রহমান বলছেন, ‘প্রথমে আমরা যে তিন কোটি টিকা পাবো, তাতে দেড় কোটি মানুষকে দুটি করে টিকার ডোজ দেয়া যাবে। প্রতি মাসে আমরা ২৫ লাখ মানুষকে টিকা দেবো।’

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যারা সামনের সারিতে কাজ করেন, তারা আগে টিকা পাবেন। যেমন স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ষাট বছরের বয়স যাদের বেশি, নানারকম জটিলতা যাদের রয়েছে, তারা আগে টিকা পাবেন। প্রতি মাসে সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হবে যে, কোন মাসে কাদের বা কোন শ্রেণী-পেশার মানুষ টিকা পাবেন। সেই অনুযায়ী তারা মোবাইল অ্যাপে নিজেদের নিবন্ধন করবেন।

তখন সরকার একটি তালিকা পাবে। সেই তালিকা অনুযায়ী কবে কখন কাকে টিকা দেয়া হবে, কোথায় কোন সময় তারা টিকা পাবেন, সেটা ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে। সেই অনুযায়ী নির্ধারিত কেন্দ্রে হাজির হয়ে তারা টিকা নেবেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যাদের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা রয়েছে, তাদের সহায়তা করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও জনপ্রতিনিধিদেরও এর সাথে সম্পৃক্ত করা হতে পারে।

কোথায় পাওয়া যাবে অ্যাপ

অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপল – উভয় স্টোরেই এই অ্যাপটি পাওয়া যাবে। স্মার্টফোনে অ্যাপটি ডাউনলোড করে নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ-টু-আই ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এই অ্যাপটি তৈরির কাজ শেষ করে এনেছে। এখন চলছে, শেষ মুহূর্তের মডিফিকেশন বা রূপান্তরের কাজ।

কীভাবে টিকা দেয়া হবে?

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে টিকাদানের খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেটি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভ্যাকসিন বণ্টন করা হবে।

সেক্ষেত্রে প্রথমেই রয়েছে কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় সরাসরি নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী, সম্মুখসারিতে থাকা কর্মী এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল যেসব রোগী তারা। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে বয়স্ক, স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এমন বয়স্ক মানুষ, শিক্ষাকর্মী, জনপরিবহনের কর্মীরা।

তিন পর্যায়ে মোট পাঁচটি ধাপে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে। যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে তিন শতাংশ বা ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ২৮২ জনকে টিকা দেয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে সাত শতাংশ বা এক কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৭ জনকে টিকা দেয়া হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি ধাপে ১১-২০ শতাংশ বা এক কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ ভ্যাকসিন পাবেন।

তৃতীয় ও সর্বশেষ পর্যায়ে মোট দুটি ধাপে ভ্যাকসিন দেয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২১-৪০ শতাংশ বা তিন কোটি ৪৫ লাখ ৬১ হাজারের বেশি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪১-৮০ শতাংশ বা ছয় কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে। টিকা দেয়ার কার্যক্রম শুরুর অন্তত দু’সপ্তাহ আগে অ্যাপটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন কর্মকর্তারা।

দু’জন টিকাদানকর্মী ও চারজন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে মোট ছয়জন করে একেকটি দল তৈরি করা হবে যারা এই টিকাদান কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে পরিচালনা করবেন। প্রতিটি দল প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জনকে টিকা দিতে পারবে বলে ধরা হয়েছে। ছয়জনের দলগুলোতে একজন নারী ও একজন পুরুষ টিকাদানকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী থাকবেন।

কোন ধাপে কারা টিকা পাবেন?

প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে যে তিন শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আসবেন তারা হচ্ছেন সব ধরণের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজকর্মী যারা কোভিড মোকাবেলায় সরাসরি জড়িত। এদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, নার্স এবং মিডওয়াইফারি পেশায় নিয়োজিত কর্মী, মেডিকেল ও প্যাথলজি ল্যাব কর্মীরা, পেশাদার স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্ন কর্মীরা, সাইকোথেরাপির সাথে সংশ্লিষ্টরা, মেডিসিন পারসনেল, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স চালক মিলে তিন লাখ ৩২ হাজার জন।

সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী যারা স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন ধাপে কাজ করে কিন্তু সরাসরি কোভিড-১৯ মোকাবেলার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা কর্মী, ক্ল্যারিক, বাণিজ্য কর্মী, লন্ড্রি কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য গাড়ির চালক-এমন এক লাখ ২০ হাজার জনকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে।

এছাড়া দুই লাখ ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা, পাঁচ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি ফ্রন্ট লাইনে কাজ করা আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যেমন পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, আনসার, ভিডিপি সদস্য, তিন লাখ ৬০ হাজার অন্যান্য বাহিনী যেমন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড ও প্রেসিডেন্ট গার্ডের সদস্য, বিভিন্ন সরকারি দফতরের ৫০ হাজার কর্মকর্তা, ফ্রন্টলাইনে কাজ করা সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী ৫০ হাজার জনকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে।

এই ধাপে আরো যারা ভ্যাকসিন পাবেন তারা হচ্ছেন, জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্মী, ধর্মীয় নেতা, দাফন ও সৎকারে নিয়োজিত কর্মী, ওয়াসা, ডেসা, তিতাস ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, স্থল, সমুদ্র ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী শ্রমিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মী, ব্যাংক কর্মী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম রয়েছে এমন রোগী, রোহিঙ্গা এবং বাফার, জরুরি ও মহামারী ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মী।

প্রথম ধাপের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিকা দেয়া হবে ৬০ বছর বা তার অধিক বয়স্ক নাগরিকদের। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম ধাপে ৫৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নাগরিক, বয়স্ক এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষ, শিক্ষক এবং সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী, প্রথম পর্যায়ে বাদ পড়া মিডিয়া কর্মী, দুর্গম এলাকায় বসবাসরত মানুষ, আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য, গণপরিবহন কর্মী, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ওষুধের দোকানের কর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, পতিতা ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যরা।

তৃতীয় পর্যায়ের দুটি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপে যাদের টিকা দেয়ায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে তাদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী যারা আগের ধাপে টিকা পাননি, গর্ভবতী নারী, অন্যান্য সরকারি কর্মচারী, অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী কর্মী, অন্যান্য স্বায়ত্বশাসিত ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, রফতানি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মী, বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বন্দর কর্মী, কয়েদি ও জেলকর্মী, শহরের বস্তিবাসী বা ভাসমান জনগোষ্ঠী, কৃষি ও খাদ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত কর্মী, ডরমেটরির বাসিন্দা, গৃহহীন জনগোষ্ঠী, অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, বাদ পড়া গণপরিবহন কর্মী, বাদ পড়া ৫০-৫৪ বছর বয়সী নাগরিক, জরুরি ও মহামারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা।

তৃতীয় পর্যায়ের শেষ ধাপে যারা টিকা পাবেন তারা হচ্ছেন অন্য ধাপে বাদ পড়া যুব জনগোষ্ঠী, শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থী, এবং এর আগের সব ধাপে বাদ পড়া জনগোষ্ঠী।

সব মিলিয়ে ৮০ শতাংশ জনগণকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে ১৯২ দিন সময় লাগবে বলে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচি চলবে। সরকারি ছুটির দিনে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত কিছু টিকাদান কেন্দ্রে সন্ধ্যায় টিকা দেয়া হবে।

ভ্যাকসিনগুলোকে জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা পর্যায় এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় রেফ্রিজারেটর ট্রাকে করে পরিবহন করবে ইপিআই। জাতীয় পর্যায় এবং অগ্রাধিকার পরিকল্পনার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের টিকার আওতায় আনতে আলাদা পরিকল্পনা প্রণয়নেরও কথা বলা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে কম ঝুঁকিতে রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীকে টিকা দেয়া হবে।

সূত্র : বিবিসি