এবারের মতো রক্ষা পেলেন মেজর হাফিজ ও শওকত

সম্প্রতি দেয়া শোকজের জবাব সন্তোষজনক হওয়ায় এবং ভবিষ্যতে দলের প্রতি আনুগত্য রেখে চলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় আপাতত বিএনপির দুই ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দলের স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল সভায় শোকজের জবাব পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।

শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সভা শেষে এসব কথা জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য।

এদিকে সভা শেষে দলের সিদ্ধান্ত কবে নাগাদ গণমাধ্যমে তুলে ধরা হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামীকাল সোমবার স্থায়ী কমিটির আলোচনার বিষয়বস্তু গণমাধ্যমকে জানানো হবে।’

স্থায়ী কমিটির ওই সদস্যরা বলেন, ‘দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যানকে শোকজ করতে গিয়ে দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ যে ভাষায় চিঠি দিয়েছেন, তাতে কষ্ট পেয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এটি শুধু হাফিজকে অসম্মান করা হয়নি; বরং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও অসম্মান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কাউকে শোকজ করা হলে তার চিঠি যেন মার্জিত ভাষায় দেওয়া হয়, সে বিষয়ে রিজভীকে সতর্ক করা প্রয়োজন বলে মনে করেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।’ চিঠির ভাষায় হাফিজের কষ্ট পাওয়ার বিষয়টি রিজভী আহমেদকে জানিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরের কাছে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় লন্ডন থেকে যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও অংশ নেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

এদিকে ১৪ ডিসেম্বর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে শোকজ করে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল তার জবাব দিয়েছেন তিনি। গতকাল শনিবার সকালে তার পক্ষে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে চিঠির জবাব পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তার বনানীর বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হাফিজ। এ সময় হাফিজ বলেন, ‘শোকজের চিঠি পেয়ে আমি হতবাক হয়েছি, অপমানিত বোধ করছিলাম। একপর্যায়ে পদত্যাগের কথাও ভেবেছিলেম। তবে জবাব দেওয়ার পর শীর্ষ নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘দলে (বিএনপিতে) কিছু টাউট-বাটপার আছে, এরা ছড়ায় যে উনি তো সংস্কারপন্থি। আরে সংস্কার তো ভালো জিনিস। রাজা রাম মোহন রায় সংস্কার করেছেন। গান্ধী সংস্কার করেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা সংস্কার করেছেন। তবে খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার চিন্তা তখনো ছিল না, এখনো নেই। আমি বিএনপির একজন অনুগত সৈনিক।’

তিনি বলেন, ‘আমার বিনীত অনুরোধ, আমার বক্তব্য স্থায়ী কমিটির সদস্যের সামনে উপস্থাপন করা হোক। বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে যদি দোষী সাব্যস্ত করা হয়, আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি। আমি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি সর্বদাই শ্রদ্ধা পোষণ করি।’

দুঃখ প্রকাশ করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাতে অনেক ভুল রয়েছে। এখানে প্রটোকল ও সৌজন্যতার ব্যত্যয় ঘটেছে। আমি ২৯ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আমার যোগদানের তারিখ, ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়ার তারিখ, আমার নামের বানানসহ অনেক ভুলই রিজভীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে দৃশ্যমান।’

এ সময় তিনি বলেন, ২০২১ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই দলের জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করা হোক। কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি-বাণিজ্য এবং মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসায় তার তদন্তও দাবি করেন তিনি।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাফিজ বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীদের চিন্তা করতে বলি, দেশের জনপ্রিয় দল বিএনপি কেন আজকে ক্ষমতার বাইরে? কারা এর জন্য দায়ী? চিন্তা করেন, মূক ও বধির না হয়ে চিন্তা করেন। দলকে ভালোর জন্য অবদান রাখুন। দলকে সাজেশন দেন, কী করা উচিত। কেবলমাত্র তোষামোদ করে দায়িত্ব শেষ করবেন না।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য, মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য, জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য, বাকস্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য এবং এই অবৈধ সরকারকে বিদায় করার জন্য যেকোনো সংগ্রামে আমি সব সময় প্রস্তুত থাকব।’

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হাফিজ বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের কোণঠাসা করে রাখার জন্য একটি মহল সক্রিয় রয়েছে।’

ভোলার লালমোহন-তমজুদ্দিন আসনে ছয়বারের সাংসদ হাফিজ ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর। ফুটবলার হিসেবেও দেশে খ্যাতিমান ছিলেন তিনি।

সুত্র: দেশ রূপান্তর