আর কত নিচে নামবেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা

বিএনপিকে বলা হয় দেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের প্রধান ফ্লাটফর্ম। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দলটির ১৯ দফা কর্মসূচিতে সে প্রসঙ্গে বিস্তর বিবরণ রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘদিন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের অধিকার আদায়ে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিবেশি দেশ ভারতের আগ্রাসী নীতির প্রতিবাদে সব সময় ছিল সোচ্চার। দেশিও কিছু দিল্লির তাবেদারদের মুখোশ খুলে দিয়ে জনগণের কন্ঠসরে পরিণত হয় দলটি। সেই দলের নেতাদের অনেকেই এখন উল্টো দিল্লিকে খুশি করতে প্রতিযোগিতা নামেছেন। দিল্লি তোষণ নেতা তাদের প্রধান নীতি হয়ে গেছে।

এক সময় খালেদা জিয়া রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে ঢাকায় সফররত ভারতের প্রভাবশালী নেতা প্রণব মুখার্জির বৈঠক বাতিল করেছে। এখন দলটির নেতারা দিল্লির সাউথ ব্লকের তাবেদারি করতে এতোই উদগ্রীব যে ঢাকা সফররত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে আয়োজিত বৈঠক বাতিল করে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা।

ভারতের মোদী সরকারের অনুকম্পায় দলটির কিছু নেতা এতোই মরিয়া যে জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের ইমেজ হারাতে বসেছে। এ অবস্থায় দলটির মাঠ পর্যায়ের নেতাদের প্রশ্ন আর কতো নীচে নামবে বিএনপি?

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি। এই তকমা নিয়েই একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা পায় দলটি। সীমান্ত হত্যা, পানি বন্টন সমস্যা নিয়ে সোচ্চার থাকার কারণে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার সব সময় বিএনপিকে কাছে পেতে চালিয়েছে আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু কোন আশ্বাসেই নিজের স্বকীয়তা বিলিয়ে দেননি জিয়াউর রহমান কিংবা বেগম জিয়া। দলের প্রধান কারাবন্দী হওয়ার পর থেকেই একটি অংশ বিএনপিকে আদর্শ, মূল্যবোধ ও নীতিচ্যূত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে অভিযোগ করে আসছে নেতাকর্মীরা।

ইসলামী বিশ্ব থেকে দলকে দূরে রেখে ভারতের অনুগত দল হিসেবে গড়ে তুলতে এই অংশটি কাজ করে যাচ্ছে বলেও মনে করেন তারা। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের ভারত সফরে গিয়ে বিরোধীতা না করার অঙ্গীকার করে আসা, বাংলাদেশে সফররত যে কোন পর্যায়ের প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাত পেতে মরিয়া হয়ে ওঠাকে তাই ভালোভাবে নিচ্ছেন না তারা। আর সর্বশেষ ঘটনাটি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের।

ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল বুধবার। এদিন সকাল ১০টায় রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপির প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠকের কথা ছিল ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার। অথচ নির্ধারিত সময়ের মাত্র তিন ঘণ্টা আগে পূর্ব-নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দিয়েছে বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশন। বৈঠক বাতিলের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ঠিক কী কারণে শেষ মুহূর্তে বৈঠকটি বাতিল হলো সে সম্পর্কে কিছু জানেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শ্রিংলার সঙ্গে বৈঠকে আমির খসরুর পাশাপাশি দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের অংশ নেয়ার কথা ছিল। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে শামা ওবায়েদকে ফোন করা হয়। তিনি এ বিষয়ে কোনো কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, কিছু জানার থাকলে দলের শীর্ষ নেতাদের কাছেই জানতে হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে। বিএনপির অন্যতম একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপির প্রতিনিধি দল ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে বৈঠক করবে এমন খবরই দলের বেশিরভাগ নেতা জানেন না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দল কি রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে যে, একজন সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ধর্ণা দিতে হবে। আবার তারা বৈঠক বাতিল করার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে।

সাবেক ছাত্র নেতা ও বিএনপির একজন সম্পাদক বলেন, রাজনৈতিক আদর্শ থেকে যদি বিচ্যুত হয় তাহলে কেউ আপনাকে দাম দেবে না। বিএনপি তার প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনীতিতে নেই। এ কারণে বিএনপিকে এখন ভারত কিছু মনে করে না। অথচ এই ভারতই বিএনপির সাথে সম্পর্ক করার জন্য কত কাঠখড় পুড়িয়েছে।

বিএনপির আন্তর্জাতিক অ্যাফেয়ার্স উইংয়ের এক নেতা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ট বন্ধু ভারত। এখানে বিএনপি যতই চেষ্টা করুক ভারতের বন্ধু হতে পারবে না। ভারত সব সময় আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের ভারতপন্থী নেতারা এ বিষয়টি কবে বুঝবে? তারা যে বিএনপিকে আর কত নিচে নামাবে?

বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বলেন, কেউ যদি আত্মীয়তা করতে না চায় তাহলে বার বার তার কাছে অনুনয় বিনয় করার কোন কারণ তো দেখি না। বিএনপি তো দুর্বল বা জনভিত্তিহীন রাজনৈতিক দল না। যে কোন সম্পর্ক গড়ার আগে জনগণের সেন্টিমেন্ট বুঝতে হবে। জনগণের সেন্টিমেন্টের বাইরে গিয়ে যদি বিএনপি কারো সাথে সম্পর্ক গড়ে তাহলে জনগণও তাদের সমর্থন তুলে নেবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কাছে ধর্ণা দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম না। স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানান, বিএনপির একজন বুদ্ধিজীবী গত ২০ ফেভ্রুয়ারি ভারতীয় হাইকমিশনে বেগম জিয়ার মুক্তি দাবি নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তাকে এও জানিয়ে দেয়া হয়েছে ভারত মুক্তি চাওয়া না চাওয়া কোন বিষয় না, আপনাদের (বিএনপি) দলের একটি অংশই চাচ্ছে না বেগম জিয়া মুক্ত হোক।

বিএনপির নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেছিলেন ১৯ দফা কর্মসূচি। এর সাথে ইসলামী মূল্যবোধ, ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের কারণে খুব অল্পসময়েই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় বিএনপি। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার এই মূলনীতিতে অবিচল থেকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তিন তিন বার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে দলটি। তিনিও দেশ ও রাষ্ট্র বিরোধী কোন প্রস্তাবে পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে কখনো আপোষ করেননি। সীমান্ত হত্যা, পানির নায্য হিস্যা আদায়ে সব সময় সোচ্চার থেকে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থনও পান তিনি। দলের এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ভারতবিরোধী দল হিসেবেও পরিচিতি পায় বিএনপি।

২০০০ সালে এক ইন্টারভিউতে খালেদা জিয়াকে ভারত নিয়ে তার দল বিএনপির অবস্থান জানতে চেয়ে সাংবাদিক মতিউর রহমান প্রশ্ন করেছিলেন- অনেক সময় আপনার দল বিএনপির বিবৃতিতে তীব্র ভারত বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায় কেনো? জবাবে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে সম্মানের সাঙ্গে বাস করতে চাই। আমাদের দেশ ছোট হতে পারে, আমাদের একটা আত্মমর্যাদাবোধ আছে। কিন্তু বড় দেশ বলে ভারত যা বলবে তা মেনে নিতে হবে, এটা হতে পারে না। আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করলে, দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে অন্যায়গুলোর কথা আমাদের বাধ্য হয়ে বলতে হয়। সেগুলো বলার কারণে যদি আমাদের ভারত বিরোধী মনে করেন, তা হলে আমার কিছু বলার নাই।

ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে এক সময় ভারত সরকার ও সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপির দ্বারস্থ হতো। ২০১২ সালে বিরোধী দলে থেকেও ভারত সফরে গিয়ে পেয়েছিলেন বর্ণাঢ্য আতিথ্য, তার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। পরের বছর ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সাথে বৈঠক বাতিল করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

যে বিএনপির সাথে সম্পর্ক করতে এক সময় ভারত কাঠখড় পোড়াতো সেই বিএনপি এখন রাজনৈতিক দ্বৈন্যদশার কারণে ভারতের যে কোন পর্যায়ের প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎ পেতে মরিয়া হয়ে যায়। প্রত্যাখ্যাত হয়েও আশায় বুক বাঁধে ভারতের অনুকম্পা পেতে। বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বৈঠক বাতিল হওয়ার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দল যে কাদের সাথে সম্পর্ক করতে চায়, কাদের বন্ধু বানাতে চায় সত্যিই বোঝা মুশকিল।

রাজনীতিতে সফল হতে হলে আপনাকে সঠিক বন্ধু বেছে নিতে হবে। অপাত্রে মাল্য দান করে কখনো কোন কাজ হয় না। তিনি বলেন, ভারত কখনো বিএনপির বন্ধু ছিল না, আগামীতে হবে এমনটা যারা ভাবেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন এবং শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার আদর্শের রাজনীতি ভুলে গেছেন।

ছাত্রদল নেতা মামুন খান বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের লড়াই শুধু গণতন্ত্রের জন্য নয় সাথে ইসলামী মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে সকল ধর্মের স্বাধীনতা সুরক্ষার লড়াই! এটাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া আদর্শের মূলমন্ত্র! যদি সে পথে চলতে পারি তবেই মুক্ত হবে দেশমাতাগ্ধ, ফিরবে গণতন্ত্র!

যদিও সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে জেএসডির পতাকা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আসার সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতে উপস্থিত থাকা অবস্থায় দিল্লিতে দাঙ্গা হয়েছে এবং এ দাঙ্গার জন্য অভিযোগের তীর মোদির দল বিজেপির দিকে তাক করা হয়েছে। এই মুহূর্তে তার বাংলাদেশে আসা কতটা শোভনীয় হবে তা ভেবে দেখা উচিত।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এরই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে বিএনপির প্রতিনিধি দল ভারত সফরও করেছে। বিএনপির তিন নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সে সময় দিল্লি গিয়েছিলেন। বাংলাদেশে ‘প্রকৃত গণতান্ত্রিক আবহ প্রতিষ্ঠায়’ সাহায্য করার আরজি নিয়েই তারা সেখানে যান বলে খবরে প্রকাশ পায়। বিএনপির নেতাদের ওই সফরের পর দলটির অনেক নেতাই বলছিলেন, এর মাধ্যমে তাদের দল ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসছে।