অবহেলিত মিরাজই এখন অসহায়দের ভরসার স্থল

মহান সৃষ্টিকর্তার এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি তিনি, জন্ম থেকেই নেই দুই হাত। শারিরীক বিকলাঙ্গ হওয়ায় তাকে সামাজিকভাবে অবহেলা ও বাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। তার প্রবল ইচ্ছা ছিল- শিক্ষায় আলোয় আলোকিত হওয়ার, কিন্তু তাকে শুরুতে স্কুলেও ভর্তি করাতে রাজি হননি শিক্ষকরা। তবুও হার মানেননি জীবন যুদ্ধে। জীবনযুদ্ধে পার করেছেন ২০টি বছর। এর মধ্যেই শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, কর্মস্থানসহ অর্জন করেছেন নানা খ্যাতি। অবহেলিত শারিরীক প্রতিবন্ধী এই তরুণই আজ হাজারো তরুণে অনুপ্রেরণা, অসহায়দের ভরসার স্থল। বলছিলাম পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর গ্রামের মিরাজুল ইসলাম মিরাজের কথা।

যাত্রাপুর গ্রামের তোরাব আলী ও সূর্য খাতুনের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মিরাজ সবার ছোট। যার থেকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা পেয়েছেন সম্প্রতি সেই মাকেও হারিয়েছেন মিরাজ। দারিদ্র পরিবারের সন্তান মিরাজের সফলতার পথ এতো সহজ ছিল না। হাজারো গিরিখাদে ভর্তি ছিল তার পথ। কিন্তু কখনও কোন বাঁধায় কিছুতেই থেমে যাননি।

শারিরীক প্রতিবন্ধী হওয়ায় জন্মের পর থেকেই সমাজের মানুষ তাকে অবহেলার চোখে দেখতো। কেউ কেউ তাকে ভবিষ্যতের ভিক্ষুক হিসেবেও তিরস্কার করতো। ভর্ৎসনাকারীদের ভর্ৎসনা-উপহাসই তাকে অপরিসীম স্বপ্নের অনুপ্রেরণা জোগায়। শুরুতেই মিরাজ চেয়েছিলেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে কিন্তু সেপথও সহজ ছিল না। তাকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলে বিকলাঙ্গ হওয়ায় স্কুলেও ভর্তি করাতে অস্বীকৃতি জানান শিক্ষকরা। তারপরেও ভেঙে পড়েননি তিনি। বোন বাঁশের কাঠি বানিয়ে দেন পা দিয়ে মাটিতে লেখার জন্য।

প্রথম প্রথম লিখতে পারতো না, আস্তে আস্তে মাটিতে লেখা শেখেন মিরাজুল ইসলাম। পরবর্তীতে পা দিয়ে লিখে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। দুটি হাত না থাকা সত্ত্বেও পা দিয়ে সব ধরনের কাজ করতে পারেন তিনি। মনের প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। মিরাজুল ইসলাম আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ‘এ গ্রেট’ নিয়ে এসএসসি পাস করেন। সর্বশেষ চলতি বছরে পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.৮৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

এখন মিরাজের সফলতার গল্প অনেক। ইচ্ছেশক্তি থাকলে মানুষকে যে দমিয়ে রাখা যায় না মিরাজ তারই প্রমাণ। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় মাই টিভির “আমরাও পারি” নামের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন মিরাজ। আর এখন মিরাজ নিয়মিত টিভি চ্যানেলগুলোতে বিনোদন দিয়ে যাচ্ছেন। প্রযুক্তিখাতে গড়েছেন নিজের ক্যারিয়ার। তিনি এখন সফল ফ্রিল্যান্সার ও ইউটিউবার। আর্থিকভাবেও সফলতা এনেছেন তিনি। হাল ধরেছেন পরিবারের। এছাড়াও তার ব্যক্তিগত টাকায় এতিম ও অসহায় মানুষদের মাঝে নিরলস ভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। যেখানে মিরাজের দুটো হাত নেই এর পরেও তিনি নিরলসভাবে মানুষের সহযোগিতায় নিজেকে নিয়োজিত করছেন।

জীবনযুদ্ধে জয়ী মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার যখন স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি হয়, তখন থেকেই নিজেকে নিয়ে ভেবেছি। আমি পরিবার-সমাজ কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাইনি। প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছি। হাসিমুখেই মুখোমুখি হয়েছি নানা প্রতিবন্ধকতার। কিন্তু থেমে থাকেনি। ভেবেছি- আমাকে কিছু করতেই হবে, সেই থেকেই আজকে এই পর্যায়ে।’

অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যায় নিয়ে মিরাজ বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি অসহায়-অবহেলিত মানুষগুলোর কষ্ট। তাদের কষ্টগুলো যে আমাকে আঘাত করে। তাই আমি তাঁদের পাশে থেকে সহযোগিতা করতে চাই, তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিরাজের বোন মুক্তা খাতুন বলেন, ‘আমাদের পরিবার ছিল আর্থিকভাবে অসচ্ছলতায় ভরা। তাকে নিয়ে আমরা শুরুতে অনেক চিন্তা করেছি। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম যে আল্লাহ তাকে কোন অবস্থা রাখে। স্কুলে যখন ওকে ভর্তি করেনি তখন অনেক কেঁদেছি। কিন্তু তারপরও আমরা থেমে থাকেনি। ওঁ যে আজকে এই পর্যায়ে যাবে তা আমরা কল্পনাতেও ভাবেনি।’

লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, ‘মিরাজকে নিয়ে আমাদের ইউনিয়নবাসী গর্ববোধ করে। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও মিরাজ যে সফলতা দেখিয়েছে তা শুধুমাত্র প্রশংসার দাবি রাখে না। আমাদের মিরাজ আজ অনেক তরুণ-যুবকদের অনুপ্রেরণা। শুনেছি কিছু তরুণে কর্মস্থানও করেছে সে, অনেক যুবকেরই ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এমন যুবক তরুণ সমাজের কাছে আদর্শ হতে পারে।’

আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাকসুদা আক্তার মাসু বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবহত নয়। তার ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে প্রশসানের সহযোগিতা লাগলে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিত করা হবে।’