অবশেষে ২৫ বছরের রাজত্বের পতন

নানা শঙ্কা-আশঙ্কা কাটিয়ে অবশেষে দেশব্যাপী আলোচিত পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে নৌকার প্রার্থী দীর্ঘ ২৫ বছরের চেয়ারম্যান মো. আবু সাঈদ খানকে ৫ হাজার ৬০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. সুলতান মাহমুদ।

বুধবার (১৫ জুন) রাত ১০টা ৩৭ মিনিটে জেলা নির্বাচন অফিসের সম্মেলন কক্ষে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন পাবনা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কায়ছার মোহাম্মদ।

বেসরকারি ফলাফলে মোট ১৬টির কেন্দ্রের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো: আবু সাঈদ খান পেয়েছেন ১১ হাজার ৩৩৭ ভোট। বিজয়ী প্রার্থী মো: সুলতান মাহমুদ ১৬ হাজার ৯৩৭ ভোট। মোট ভোট কাস্টিং হয়েছে ২৯ হাজার ৪৬টি। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৭৭২টি ভোট। বৈধ ভোটের সংখ্যা ২৮ হাজার ২৭৪টি। প্রাপ্ত ভোটের হার ৭৫ দশমিক ৯২ শতাংশ।

এর আগে বিকেল থেকে পাবনার বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে কিছু ফলাফল ছড়িয়ে পড়ে। ‌ এতে বিপুল ভোটে সুলতান মাহমুদকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন পেজ গ্রুপে ভোটের ব্যবধান বিভ্রান্ত দেখা যায়। পরে এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এই প্রতিবেদককে ফেসবুকের এই ফলাফল অসমর্থিত বলে নাকচ করে দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা কায়সার মোহাম্মদ।

এর ফলে আবু সাঈদের দীর্ঘ ২৫ বছরের রাজত্বের পতন হলো। ১৯৯৭ সালে আতঙ্কের জনপদখ্যাত এই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গোলাম মোস্তফা কফিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন আওয়ামী লীগ নেতা আবু সাঈদ খান। এরপর তিনি একাধারে ৪ বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন। তার মেয়াদকালে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয় ভাঁড়ারা। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে এক চেয়ারম্যান প্রার্থী নিহতের ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচিত হয়।

এর আগে বুধবার (১৫ জুন) সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত এই ভোটগ্রহণ, বিরতিহীনভাবে চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। সকাল থেকেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন ছিল। পুরুষ ও নারী উভয় ভোটারদের ছিল লম্বা লাইন। নানা শঙ্কার মধ্যেও পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে তারা উচ্ছাস প্রকাশ করেন।

এদিকে ভোটকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে গোটা ভাঁড়ারা ইউনিয়ন। ৫ শতাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। সন্দেহভাজনদের করা হয় জিজ্ঞাসাবাদ। পুলিশ, ডিবি, র‌্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো।

গত ডিসেম্বরে প্রচারণাকালে এক চেয়ারম্যান প্রার্থী নিহতের ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচনায় আসে ইউনিয়নটি। ফলে এবার ভাঁড়ারার দিকে তাকিয়ে পাবনাবাসীসহ গোটা বাংলাদেশ, তাই অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন। স্মরণকালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে গোটা ভাঁড়ারা ইউনিয়ন জুড়ে।

আতঙ্কের জনপদ খ্যাত এই ইউপিতে ৩৮ হাজার ২শ ৫৭ জন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার ১৮ হাজার ২৯৩ জন এবং পুরুষ ভোটার ১৯ হাজার ৯৬৪ জন। চেয়ারম্যান পদে প্রতিদন্দ্বিতা করছেন ২ জন প্রার্থী। আর ৯টি সাধারণ ও ৩টি সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫৩ জন, এর মধ্য নারী সদস্য পদে ১৩ জন এবং পুরুষ সদস্য পদে ৪০ জন প্রার্থী। এই ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৬টি, বুথ রয়েছে ১০৪টি।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণার সময় পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবু সাঈদ খান (৫২) ওরফে সাঈদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে সংঘর্ষে আরেক চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াসিন আলম (৩৫) নিহত হন। এঘটনায় ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদের সব (চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য, সাধারণ ওয়ার্ড সদস্য) পদের নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। পরে গত ২৮ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন থেকে ১৫ জুন ভোটগ্রণের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করা হয়।