• আজ
  • মঙ্গলবার,
  • ২১শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
  • |
  • ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ


Text_2

‘মেয়েটির ছেঁড়া স্যান্ডেল পড়েছিল রাজপথে’

প্রকাশ: ২২ মে, ২০১৫ | রিপোর্ট করেছেন

মাসুদা ভাট্টি

 

যে পথ দিয়ে মিছিল চলে গিয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীনতার জন্য এখানেইতো ভাষার জন্যও প্রতিবাদ হয়েছিল কোনো কালে, এখন এখানে মেয়েটির ছেঁড়া স্যান্ডেল পড়ে আছে।

মেয়েটি বেরিয়েছিল, একা নয়, বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঝলমলে রোদের চেয়েও উজ্জ্বল ছিল তার চোখ, ভয় ছিল একটু যে ভয় জন্ম থেকেই তার আছে। সেই কোন্ শিশুকালে মেয়েটিকে তার বাবার বয়েসি এক পুরুষ আদর করতে করতে একটু বেশিই আদর করেছিল, মেয়েটি জীবনের আর সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুঝেছিল, আদরের জ্বালা কতো।

মেয়েটি ভিড়কে ভয় পেতে পেতে শিখেছিল কী করে ভিড় ঠেলতে হয়
গাউছিয়া কিংবা মৌচাকে গেলে মেয়েটি জানতোই যে, তাকে অন্ততঃ কয়েকটি ‘ঠ্যালা’ খেতে হবে, কখনও হাতের, কখনও কারো উদ্যত শিশ্নের, সব ভিড়ের মধ্যেই। তারপর মেয়েটি অপূর্ব দক্ষতায় জানতে শিখেছিল, ভিড়ের ভেতর কোন্ পুরুষটি তার শরীরে হাত দেবে, তাই আগে থেকেই তাকে চিনতে পেরে সরে যেতে কিংবা সেফটিপিন নিয়ে তৈরি থাকতে। মেয়েটি জেনেছে-শিখেছে-বুঝেছে ভিড় মানেই কোনো না কোনো পুরুষের লালসা চাগিয়ে ওঠা, ভিড় মানেই তাদের হাত নিশপিশ করা, তাই মেয়েটিও নিজেকে বাঁচাতে শিখে গিয়েছিল ক্রমশ ভিড় ঠেলতে ঠেলতে।

কিন্তু ভিড়ের বাইরে? কোনো এক বিখ্যাত কবির অটোগ্রাফ নিতে গেলে কবি সাহেব মেয়েটিকে ‘এসো মা এসে বলে’ বুকে টেনে নিতে নিতে তার বুকের ওপর হাতটা বেশ জোরেই বুলিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েটি তখন কথা বলতে শিখেছে। মেয়েটি সটান জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা বলুনতো, আপনার কি আনন্দ হলো খুউব? এই যে আমার বুকের ওপর হাতটা এভাবে বুলিয়ে নিলেন? কবি ভদ্রলোকের লাল মুখ তখন জ্বলে উঠেছিল রাগে। মেয়েটি কবি হতে চেয়েছিল, কিন্তু বুকের ভেতর থেকে কবি হওয়ার সাধ চলে গিয়েছিল। মেয়েটি ভেবে পায় না তখনও, কী আনন্দ হয় ওদের? একটুুখানি ছুঁয়ে দিয়ে? জোরে একটু চাপ দিয়ে? নাকি কেবলই বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা ওদের যে, ওরা পুরুষ?

মেয়েটি প্রতিবার ফেব্রুয়ারির বই মেলায় যেতো। বই কিনতে, বই দেখতে। কিন্তু মেয়েটি এও জানতো যে, বই মেলায় গেলে মেয়েটির শরীরে অসংখ্যবার হাত পড়বে পুরুষের। মেয়েটির নিতন্বে চাপ আসবে পেছন থেকে। তীক্ষè নখ মেয়েটির খোলা পিঠে বসে যাবে। চুল ধরে টান দেবে। এমনকি বইমেলার বটতলায় যখন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়, সেখানেও পেছনে দাঁড়ানো পুরুষটি তাকে চেপে রাখবে শরীর দিয়ে, মেয়েটি টের পাবে তার শরীরে একটি শক্ত দ–চাপ। মেয়েটি ভিড় সরিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে লোকটিকে দেখবে দাঁত কেলিয়ে হাসতে। কিন্তু তারপরও মেয়েটি বই মেলায় যাবেই প্রতিবছর। সাধ্যমতো বই কিনবেই। পছন্দের লেখকের অটোগ্রাফ নেবেই। সন্ধ্যের পর পরই একগাদা বই নিয়ে বাড়ি ফিরবে আর রাত জেগে বইগুলো পড়বেই।

মেয়েটি একুশের ভোরে শহীদ মিনারে যাবেই। কিন্তু মেয়েটি প্রতিবারই শহীদ দিবসের ভোরে ফুল দিতে গিয়ে পেছন থেকে, সামনে থেকে, পাশ থেকে পুরুষের নির্মম চাপের শিকার হবে, সেটা জেনেও, মেয়েটি নগ্ন পায়ে শহীদ বেদিতে সম্মান জানাবেই।

শহরের রাস্তা-ঘাট, যানবাহন, বিপনী-বিতান, বই মেলা, শহীদ মিনার – সব ভিড়ের খবরই মেয়েটি পুঙ্খানুপুঙ্খ জানে। তারপরও মেয়েটি বৈশাখী আয়োজনে যায়, কখনও একা, কখনওই ভাইয়ের সঙ্গে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে। এবারও মেয়েটি গিয়েছিল বড় ভাইয়ের সঙ্গে। একথা জেনেই যে, সে আক্রান্ত হতে পারে। ভিড়ের মধ্যে পৌরুষ জেগে ওঠা কোনো জন্তুর, ভুল হলো, জন্তুরাতো এরকম নয়, এরা কেবলই পুরুষ। কিন্তু এবার মেয়েটির অভিজ্ঞতা হলো ভিন্ন। মেয়েটিকে একগাদা পুরুষের পাল একত্রিত হয়ে রিক্সা থেকে নামিয়েছিল টেনেহিঁচড়ে., তারপর হাত দিয়ে নখ দিয়ে পা দিয়ে চোখ দিয়ে শিশ্ন দিয়ে মেয়েটিকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। মেয়েটি তখন কিছুই ভাবতে পারেনি, ভাইয়ের কথা ভাবছিলো একটু। মনে হয়েছিল ভাইটিও কি এরকম কোনো মেয়েকে একলা পেলে ভিড়ের ভেতর আঘাত করে? পোকামাকড়ের মতো মনে হয়েছিল মেয়েটির পৃথিবীর তাবৎ পুরুষদের। পোকামাকড়? নাকি রাস্তার ধুলো, যেমন শরীরে লাগলে ফুঁ দিতে হয় কিংবা ধুতে হয় ডেটল দিয়ে, সাবান ঘঁষে ঘঁষে? মেয়েটি বাড়ি ফিরে সেদিন তাই-ই করেছিল, দীর্ঘক্ষণ ধরে গোসল করেছিল, পানি ঢেলেছিল মনের ওপর, শরীরের ওপর, ধুলো ধুয়ে পরিষ্কার করেছিল ঘন্টাভ’র; মেয়েটিরও আগে ইতিহাসের মেয়েরা যা করে এসেছে জীবনভর।

ওরা বলে, মেয়েদের বাইরে যাওয়ার কী দরকার? মেয়েটি ভাবে, বাইরেটা কি কেবল পুরুষের? ঘরের ভেতরটাওতো পুরুষেরই, সেখানেওতো মেয়েটিকে সেই শিশুবেলা থেকেই আক্রান্ত হতে হয়েছে। ওরা বলে, মেয়েটি কেন শাড়ি পরে? মেয়েটিতো কথিত ‘ভদ্র’ পোশাক পরেও দেখেছে, কোনো পুরুষের চোখতো মেয়েটির বুক আর পেছন থেকে ওপরে বা নীচে নামেনি? ওরা বলে মেয়েটি ঊদ্ধত, মেয়েটি কারো কথা শোনে না, মেয়েটি বেয়াড়া – মেয়েটি ভাবে সবকিছু মেনে নিলেও কি সে নিস্তার পেতো? ভিড় বাসে বোরকা পরা নারীকে আক্রান্ত হতে দেখেনি মেয়েটি? মেয়েটি কি জানে না যে, অসীম ধর্মপ্রাণ ঘরে থাকা নারীরাও বার বার আক্রান্ত হয় দেশেদেশে? তাহলে কেন তাকে নমনীয় হতে হবে? কার জন্য? যাদের হাত নেই, পা নেই, চোখ নেই, চুল নেই, দাঁত নেই, হৃদয় নেই, যাদের শরীরময় কেবলই শিশ্ন আর শিশ্ন, তাদের জন্য?

মেয়েটি স্নান সেরে শুদ্ধ হয়ে ভেজা চুলের সুগন্ধ ছড়াতে ছড়াতে টেলিভিশন খুলে বসে। তাকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে চারদিকে। পুরুষরা কেউ কেউ ক্ষমাও চাইছে। মেয়েটি হাসে মনে মনে। মেয়েটির ধুলোবালির কথা মনে হয়। শরীরে লেগেছিল, এবার পরিচ্ছন্ন লাগছে বেশ। ঘুমুতে যাওয়ার আগে, মেয়েটি সিদ্ধান্ত নেয়, পরের বার মেয়েটি আরো প্রস্তুত হয়েই যাবে, বইমেলায়, শহীদ মিনারে এবং বৈশাখের আয়োজনে। এবার যেখানে ছেঁড়া স্যান্ডেল রেখে এসেছে, সেখানে। কিন্তু আগামিবার আর স্যান্ডেল রেখে আসবে না সে, মেয়েটির চোখেমুখেবুকে রক্তনেশা খেলা করে তখন।