• আজ
  • বুধবার,
  • ২১শে আগস্ট, ২০১৯ ইং
  • |
  • ৬ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ


Text_2

কবিরাজই চিকিৎসক: বিশ্বাসকে পুঁজি করে চলছে অপচিকিৎসা

প্রকাশ: ৬ আগ, ২০১৯ | রিপোর্ট করেছেন নিজস্ব প্রতিনিধি

পাবনার প্রত্যন্ত এলাকায় জটিল সব রোগের জন্য চলছে কবিরাজি চিকিৎসা। মানুষের ধমীর্য় বিশ্বাসকে পুঁজি করে চিকিৎসার নামে ভন্ডামি আর প্রতারণা। এসব অপচিকিৎসায় রোগীরা আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হলেও কবিরাজের দাবি এমন চিকিৎসায় অনেক রোগীকে সুস্থ করে তুলেছেন তারা। প্রতিদিনই শতশত মানুষ অপচিকিৎসায় প্রতারণার শিকার হচ্ছেন; কিন্তু এসব প্রতারক কবিরাজ-ফকিরের বিষয়ে উদাসীন প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ।

পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার মাজাট গ্রামে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে এ চিকিৎসা কার্যক্রম। রোগীর হাত-পায়ে তেল মালিশ ও ঝাড়-ফুঁ দিয়েই নাকি রোগ ভালো করছেন কবিরাজ। এসব চিকিৎসা করতে কবিরাজ রোগীর স্বজনদের সঙ্গে আগেই চুক্তিভিত্তিক মোটা অঙ্কের টাকা ঠিকঠাক করেন। টাকা হাতে পেলেই কবিরাজ শুরু করেন তার চিকিৎসা কাযর্ক্রম। প্যারালাইসিস, পোলিও, ক্যান্সার রোগীকে গ্যারান্টি দিয়ে ভালো করে দেন তারা।

ফরিদপুর উপজেলার মাজাট গ্রামের দুই ভাই কবিরাজ পেশার পাশাপাশি এখন ডা. সেজে দেশের বেনামী কিছু কোম্পানির হোমিওপ্যাথিক ও অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেছেন। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা যেমন অর্থ হারাচ্ছে অন্যদিকে মারাত্ব অসুখেও ভুগছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, করিবাজ হাজী আজগর আলী ও তার ছোট ভাই আ. মতিন। বাবার মৃত্যুর পর তার দেখানো পথে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে বসেন হাজী আজগর আলী। কবিরাজিতে তিনি নিজেকে আরো পাকা-পোক্ত করতেই যেন হেকিমী চিকিৎসার নামে যোগ করেন দেশের বেনামী কিছু কোম্পানির অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ। কিনে নেন রোগ নির্ণয়ের কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম। আয়ত্ব করে নেন চিকিৎসা পেশা। শুরু করেন রোগীর চিকিৎসা। গ্যারান্টি দিয়ে বিভিন্ন রোগ ভালো করছেন। এমন চিকিৎসায় রোগী ও তার স্বজনরা পড়ছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

বড় ভাইয়ের দেখাদেখি ছোট ভাই আ. মতিনও জড়িয়ে পড়েন একই কাজে। আ. মতিন বড় ভাইয়ের মতো শুরু করেন হোমিওপ্যাথিক চিকিসা। বাড়িতে খুলে নেন মেডিসিনের গোডাউন। শুরু করেন রোগীর প্রেসক্রিপশন। এর মাধ্যমেই তারা দু’ভাই স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে পেয়েছেন।

সরেজমিনে জানা গেছে, কবিরাজ আজগর আলী ও আ. মতিন রোগীর আর্থিক সামথ্য অনুয়াযী চিকিৎসা প্রদান করেন। একজন নিরক্ষর কবিরাজ কিভাবে হেকিমী চিকিৎসার পাশাপাশি অ্যালোপ্যাথিক ও হোমিও চিকিসা করতে পারে এমন প্রশ্ন এলাকাবাসীর। দু’ভাইয়ের প্রতিযোগিতামূলক চিকিৎসা বন্ধ না হলে বড়ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা মুখে পাড়তে পারে সাধারণ মানুষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন জানান, দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা বিভিন্নভাবে যৌন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত তাদের নগদ টাকাপয়সা-দামি মোবাইল চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে এই এলাকায়।

গোলাম মঞ্জুর নামে এক ব্যবসায়ী জানান, হাজী আজগর আলীর ছেলে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ছেলের কমিশনের কথা মাথায় রেখে আজগর আলী কবিরাজির পাশাপাশি ডাক্টার বনে যান। ছেলের মৃত্যুর পরও লাভজনক এ পেশা তিনি বদলাতে পারেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় মুদি দোকানদার জানান, প্যারালাইসিস রোগীকে এভাবে চিকিৎসা একটি ভন্ডামী ছাড়া কিছুই নয়। রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্র বা ভালো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগ ভালো হতো। কবিরাজ প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বাধা দিতে গেলে উল্টো হুমকি শুনতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে স্থানীয় চিকিৎসক আব্দুস সালাম জানান, মানুষের মধ্যে এখনো সেই পুরনো আমলের ধ্যান-ধারণা রয়েছে। এসব ধ্যান-ধারণার কারণে তারা তেল মালিশ ও ঝাড়-ফুঁকে বিশ্বাসী। এমন চিকিৎসা একটি ভন্ডামী ও প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।

এ ব্যাপারে কবিরাজ আজগর আলীর সঙ্গে যোগা যোগ করা হলে তিনি জানান, দীঘির্দন ধরে তিনি পোলিও, জন্ডিস, বাত, ব্যথা ও প্যারালাইসিসহ নানা রোগের চিকিৎসা করে আসছেন। এর মধ্যে তিনি প্যারালাইসিস রোগের চিকিৎসা বেশি করেন। তার হাতে অনেক রোগী সুস্থ হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অপর কবিরাজ আ. মতিন বলেন, আমি গাজীপুর থেকে টেনিং নিয়ে এসেছি। সনদ ও নিয়ম মেনেই কবিরাজির পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন করে রোগীকে ওষুধ দিচ্ছি।

ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রতন কুমার রায়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি।

এ বিষয়ে পাবনা সিভিল সার্জন ডা. মেহেদী ইকবাল জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে এলাকার সচেতন মহল দাবি জানিয়েছে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দুই ভাইয়ের এই প্রতারণা পেশা বন্ধ করা হোক।