• আজ
  • শুক্রবার,
  • ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং
  • |
  • ১০ই ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ


Text_2

উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে মৃত্তিকা দফতরের ভুমিকা

প্রকাশ: ৯ ফেব্রু, ২০১৯ | রিপোর্ট করেছেন শফিউল আলম দুলাল

ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির আগে সৃষ্টি করা হয়েছিল মাটি। মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে মাটিরবিকল্প নেই। মানুষকে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে হলে প্রয়োজন খাদ্যের। আর খাদ্য উৎপাদন করতে হলে প্রয়োজন মাটির। সৃষ্টিকর্তার নিপুন সৃষ্টিতে সব ধরনের মাটিতে সব ধরনের ফসল উৎপন্ন হয়না।আর সেজন্য কোন মাটিতে কোন ধরনের ফসল উৎপন্ন বেশী হবে সেটানির্ধারন করে থাকে আমাদের দেশের মৃত্তিকা উন্নয়ন দফতর। সৃষ্টিরপর থেকে অদ্যাবধি এ মাটি মানুষের জীবন ধারনের জন্য খাদ্যেরচাহিদা পূরন করে যাচ্ছে। যার সৃষ্টি আছে তার ক্ষয়ও আছে। মাটির ক্ষেত্রে তার কোন ব্যাতিক্রম কিছু নয়। তাই মাটির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে মাটির আদি সৃষ্টির অবস্থা পরীক্ষা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর এ কাজটি করছে আমাদের দেশের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউট। ১৯৬১ সালে সয়েল সার্ভে প্রজেক্ট অব পাকিস্তান নামে এ দফতরটি যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীনে ন্যাস্ত করে মৃত্তিকা জরিপ বিভাগ নামে নামকরন করে দেশের অঞ্চল ভিত্তিক কয়েকটি অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করাহয়। ১৯৭৯ সাল থেকে পাবনা জেলাতে কার্যক্রম শুরু করে দফতরটি। ১৯৮৩ সালে দফতরটিকে পূনর্গঠন করে নাম করন করা হয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউট। সে থেকে এ নামেই কৃষকদের কল্যানে তথা শষ্যের ফলন বৃদ্ধিতে মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে দফতরটি। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য ২০১৭ সালের৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করা হয় বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস।

মৃত্তিকা গবেষকগনের মতে, মাটিতে ১৭টি পুষ্টি উপাদান থাকা আবশ্যক। এর ভেতর ০৯ টি মূখ্য ও ০৮ টি গৌণ। মূখ্য বলতে নাইট্রেজেন ফসফরাস ইত্যাদি ও গৌন বলতে বোরন দস্তা, লৌহ ইত্যাদি রয়েছে। তবে আদর্শ মাটি বলতে চারটি উপাদান মাটিতে সঠিক পরিমান বিদ্যমান থাকা দরকার। যার ভেতর রয়েছে, ২৫ ভাগ পানি, ২৫ ভাগ বাযূ, ৫ ভাগ জৈব পদার্থ ও ৪৫ ভাগ খনিজ পদার্থ। এ উপাদানগুলো যে মাটিতে রয়েছে সে মাটির ফসল উৎপাদন কাংখিত পর্যায়ে পাওয়া যাবে। মাটি সৃষ্টির পর থেকে ফসল আবাদ করার ফলে ওই উপাদানগুলের বেশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যার ফলে মাটি পরীক্ষা করে ঘাটতি উপাদানগুলো বৃদ্ধির ব্যবস্থা করছে মৃত্তিকা দফতর। মাটির গুনাগুন যাচাইয়ের জন্য মাটিকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছে মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞগন। যার মধ্যে রয়েছে উপরিস্তর, মধ্যস্তর ও নিম্মস্তর। মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মধ্যস্তরের মাটি নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেনগবেষকেরা। আবার এ মাটিকে ৩২৫ টি দলে ৪৬৫টি সিরিজে ভাগ করেছেন মৃত্তিকা বিজ্ঞানীগন। তবে কৃষকদের জন্য ৫প্রকার মাটিকে নির্ধারন করা হয়েছে। মাটির বুনটের উপর ভিত্তি করে তার প্রকার নির্ধারন করা হয়ে থাকে। মাটি নিয়ে গবেষনা ও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ মাটিতে ১২ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। পাবনা মৃত্তিকা সম্পদ ইনষ্টিটিউট জেলার ঈশ্বরদী, আটঘড়িয়া ও সুজানগর উপজেলাতে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য ও গুনাগুন নির্ধারন করে মাটিতে ঘাটতি উপাদান রাসায়নিক সারের মাধ্যমে পূরনের ব্যবস্থা নিয়ে এরই মধ্যে ট্রায়াল প্লট করে ফসল আবাদ শুরুকরেছে।

এ ধরনের একজন ট্রায়ার কৃষক মনিদহ গ্রামের শফিকুল বলেছেন, মাটি পরীক্ষার পর মৃত্তিকা দফতরের পরামর্শে গম আবাদকরেছি। তিনি আশাবাদী অতীতের থেকে ফলন বেশী পাবেন।

পাবনা মৃত্তিকা সম্পদ ইনষ্টিটিউটের উর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. মো. ফারূক হোসেন বলেন, মাটি পরীক্ষারজন্য মাঠ থেকে মাটি সংগ্রহ করে সেটা ন্যাচারাল পদ্ধতিতে ঘড়েরমধ্যে শুকাতে হয়। কোন ধরনের রোদ বা তাপে সোকে শুকানো যাবে না।এমনকি কোন পশু-পাখি তার উপর যেতে পারবে না। এমন অবস্থায় ১৫থেকে ২০ দিন পর ওই মাটি পরীক্ষার জন্য রাজশাহী পরীক্ষাগারে পাঠানোহয়ে থাকে। সেখান থেকে পরীক্ষা রিপোর্ট আসার পর কৃষকের কাছেতার তথ্য দিয়ে ঘাটতির প্রয়োজনীয় উপাদান পুরনে ব্যবস্থা নেয়াহয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নায়মুল ইসলাম বলেন, মাটিরস্বাস্থ্য রক্ষার্থে ও ফলন বেশী পাবার আগ্রহে কৃষকদের ব্যাপক সাড়াপাওয়া গেছে। মৃত্তিকা গবেষণা ও সুবিধা জোড়দার করন প্রকল্প হাতেনিয়েছেন সরকার। উত্তরাঞ্চলের সকল জেলায় এ প্রকল্পের কার্যক্রম চালুথাকলেও পাবনাকে এ প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। কৃষকের স্বার্থেপ্রকল্পটি পাবনাতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সে সাথে নিজস্বপ্রসাশনিক ভবন স্থাপনের মাধ্যমে অফিস ভাড়ার বিশাল টাকা সাশ্রয়করা সম্ভব হবে।

পাবনা মৃত্তিকা সম্পদ ইনষ্টিটিউটের উদ্যোগে আকাশচিত্র বিশ্লেষন, মাঠ জরিপ, ও গবেষণাগারে মাটিরনমুনা বিশ্লেষনের ফলাফলের ভিত্তিতে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা,

জরিপ তথ্যের সঠিক ব্যবহার বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারন ওগবেষণা কর্মিকে প্রশিক্ষন প্রদান। কৃষিবিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে প্রশিক্ষন কর্মসূচীতে অংশগ্রহন, কৃষক ও অন্যান্য উপকারভোগীকে মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও সারবিশ্লেষন সেবা এবং মাটির নমুনা বিশ্লেষনের ফলাফল অনুসারে স্থানভিত্তিক ফসল চাষে সার সুপারিশ মালা প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়াও সমস্যাক্লিষ্ট মৃত্তিকা যথা, বিষাক্ত, ক্ষারীয়, চর, ল্যান্ড ব্যবস্থাপনা ওঅন্যান্য সমস্যা দুরীকরনে পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করে আসছে।মাটির উর্বরতা অবক্ষয় সমস্যা, ফসলের পুষ্টি উৎপাদনের সমস্যা মাটির রসের অভাব এবং ফলন হ্রাসের বাধা, ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণাকরন ও কৃষক পর্যায়ে অ্যাডাপটিভ ট্রায়ালের মাধ্যমে আধূনিক প্রযূক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও সচেষ্ট রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি মাঠ পর্যায় থেকে মাটি সংগ্রহ করে দিনের পর দিন সতর্কতার সাথে সেটা শুকিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে কৃষক তথা দেশের কল্যানে কাজ করছে, সেই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা। কৃষক ও দেশের কল্যানে সুষ্ঠ কাজের ক্ষেত্রে এ প্রতিবন্ধকতা গুলো দুর করা দরকার আমাদের। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোন প্রশাসনিক ভবন নেই। দফতরটি কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীনে হওয়ায় পাবনা কৃষি সম্প্রসারন অধিদফতরের অভ্যান্তরে তার প্রশসনিক ভবন নির্মান করা যায়। আর এ জন্য বিশালজায়গা পরে রয়েছে শহরের প্রান কেন্দ্র সম্প্রসারন দফতরে। সম্প্রতি আঞ্চলিক কৃষি তথ্য সার্ভিসের প্রশাসনিক ভবন নির্মান হচ্ছে এখানেই। একই সাথে মৃত্তিকা সম্পদ ইনষ্টিটিউটের ভবনটি এখানে নির্মানের ব্যবস্থা করলে সম্প্রসারন, কৃষি তথ্য ও মৃত্তিকা জরিপএকত্রে কৃষকের কল্যানে কাজ করতে পারবে। সে সাথে রাজশাহী থেকেমাটি পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে পাবনাতে একটি গবেষণাগার স্থাপনের দাবীও রয়েছে অসংখ্য সুবিধাভোগী কৃষকদের। দেশের খাদ্যরউৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের কল্যানে এ প্রতিষ্ঠানটির সুচারূরূপে কর্মপরিচালনায় কৃষকদের দাবীর দিকে কর্তৃপক্ষ দৃষ্টি রাখবে।